রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও স্বাধীনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন শুধু অপরাধই বাড়ে না; রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও কমতে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে যে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা বহন করে। মাঠ প্রশাসন ও পুলিশে রদবদল, যোগ্য কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা, গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার, যৌথ অভিযান পরিচালনা এবং জনবান্ধব পুলিশিংয়ের ওপর গুরুত্বারোপÑ সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহিতার ওপর।
দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ মোকাবিলা করতে হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার যদি সত্যিই পেশাদারিত্বকে প্রাধান্য দিয়ে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয় এবং রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করে, তবে প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়বে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বিত কর্মকৌশল বাস্তবায়ন সহজ হবে।
পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, সেটি শুধু একটি স্লোগান হয়ে থাকলে চলবে না। থানায় সেবা নিতে গিয়ে নাগরিক যেন হয়রানির শিকার না হন, অভিযোগ গ্রহণে গড়িমসি না হয়, তদন্তে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়Ñ এসব ক্ষেত্রে জনগণ পরিবর্তনের বাস্তব প্রমাণ দেখতে চায়। পুলিশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন কেবল বাহিনীর স্বার্থে নয়, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার অপরাধ প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা সময়োপযোগী। কিন্তু অপরাধ দমনের পাশাপাশি অপরাধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই অপরাধ কমে না; প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, সাক্ষী সুরক্ষা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘কোনো অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নেই’ এবং ‘কোনো ধরনের তদবির বা রাজনৈতিক চাপ বরদাশত করা হবে না’Ñ এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এই প্রতিশ্রুতির মূল্য তখনই বাড়বে, যখন বাস্তবে দল-পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে একই মানদ-ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলোÑ সবার জন্য সমান আইন।
দেশের বর্তমান বাস্তবতায় প্রশাসনিক সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। রাতারাতি পরিবর্তনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। তবে সঠিক দিকনির্দেশনা, কঠোর তদারকি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ইতিবাচক পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব। সরকারকে মনে রাখতে হবে, আইনশৃঙ্খলা শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি বিনিয়োগ, অর্থনীতি, শিক্ষা, সামাজিক স্থিতি এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশেরও অন্যতম ভিত্তি।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে কিছু বিষয়ে অবশ্যই দৃষ্টি দিতে হবে বলে আমরা মনে করি। এর মধ্য রয়েছেÑ প্রশাসন ও পুলিশে পদায়নে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে মেধা, সততা ও কর্মদক্ষতাকে একমাত্র মানদ- করতে হবে। নাগরিক হয়রানি, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ দমনে প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা নজরদারি ও কমিউনিটি পুলিশিং আরও শক্তিশালী করতে হবে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ, স্থানীয় সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত জনসম্মুখে প্রতিবেদন প্রকাশ করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আইনের প্রয়োগে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ভিন্ন আচরণ করা যাবে না। নাগরিকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এগুলোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন