বিশ্ব রাজনীতি কখনো শূন্যতায় দাঁড়িয়ে থাকে না। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, সাম্রাজ্য উঠেছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে, নতুন শক্তির জন্ম হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল, একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বলয়, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক বলয়। প্রায় চার দশক ধরে এই দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করেছে। যুদ্ধের পরিবর্তে চলেছিল স্নায়ুযুদ্ধ, প্রক্সিযুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, মহাকাশ প্রতিযোগিতা এবং মতাদর্শিক লড়াই। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর অনেকেই মনে করেছিলেন ইতিহাসের সেই দ্বন্দ্ব শেষ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে উদার গণতন্ত্র, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং পশ্চিমা মূল্যবোধই হবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান ভিত্তি। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, কোনো শক্তিই চিরস্থায়ী নয়।
বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও আর্থিক শক্তি। ডলারের আধিপত্য, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব, ন্যাটো জোটের সামরিক সক্ষমতা এবং উন্নত প্রযুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। কিন্তু সেই নেতৃত্ব এখন আর প্রশ্নাতীত নয়। চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার আঞ্চলিক প্রভাব, ব্রিকসের সম্প্রসারণ, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। দীর্ঘদিন এই নীতি বাংলাদেশের জন্য কার্যকর ছিল, কারণ বিশ্ব রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকলেও ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য কিছুটা কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখা সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা সেই স্বাধীনতার পরিসরকে সংকুচিত করছে। এখন বড় শক্তিগুলো শুধু বন্ধুত্ব চায় না; তারা কৌশলগত অবস্থানও চায়। তারা শুধু অর্থনৈতিক অংশীদার খোঁজে না; বরং তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কারা পাশে থাকবে, সেটিও নিশ্চিত করতে চায়। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে নিরপেক্ষ থাকা আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি আবার তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও। ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ, কিন্তু একই সঙ্গে এটি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। বঙ্গোপসাগর আজ শুধু একটি সমুদ্র নয়; এটি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন, নৌ-নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডর। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই অঞ্চলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে যে রাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, সে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারবে। এই কারণেই বাংলাদেশকে ঘিরে বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ ক্রমাগত বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হলো, অর্থনীতি একদিকে, কূটনীতি আরেকদিকে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় অংশ আসে পশ্চিমা বাজার থেকে। যদি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কোনো কারণে এই বাজারে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়, তবে দেশের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে। আবার একই সময়ে বাংলাদেশের বহু মেগা প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যোগাযোগ অবকাঠামোতে চীন ও রাশিয়ার বিনিয়োগ রয়েছে। অর্থাৎ উন্নয়নের জন্য চীন ও রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ, আর রপ্তানির জন্য পশ্চিমা বিশ্ব অপরিহার্য। এই দ্বৈত বাস্তবতাই বাংলাদেশের কৌশলগত সংকটের মূল।
এই কারণেই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কোনো একটি বলয়ের অংশ হবে, নাকি সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করবে? বাস্তবতা বলছে, বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় পথটিই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত। কারণ একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারকে হারানোর ঝুঁকি নেওয়া বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হতে পারে। তাই আজ বাংলাদেশের কূটনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, কীভাবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি বলয়ের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, যাতে কোনো প্রতিযোগিতার দাবার গুটিতে পরিণত না হয়ে বরং নিজের কৌশলগত গুরুত্বকে দেশের উন্নয়নের পক্ষে ব্যবহার করা যায়।
সবশেষে বলা যায়, বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন মেরুকরণ কোনো সাময়িক ঘটনা নয়; এটি একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নতুন বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে আবেগ দিয়ে নয়, বরং প্রজ্ঞা, ভারসাম্য ও দূরদর্শিতা দিয়ে পথ চলতে হবে। কারণ পরাশক্তিরা তাদের স্বার্থেই বন্ধুত্ব করে, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের স্থায়ী দায়িত্ব হলো নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর, আমরা কি অন্যের কৌশলের অংশ হব, নাকি নিজেদের কৌশল নিজেরাই নির্ধারণ করব? ইতিহাসের প্রতিটি সন্ধিক্ষণই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসী নেতৃত্ব, দক্ষ কূটনীতি, শক্তিশালী অর্থনীতি এবং এমন একটি রাষ্ট্রদর্শন, যা পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। বৈশ্বিক মেরুকরণের যুগে টিকে থাকবে সেই দেশ, যে দেশ কোনো বলয়ের অন্ধ অনুসারী হবে না; বরং নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র করে প্রতিটি বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। বাংলাদেশের সামনে আজ সেই কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় পথই উন্মুক্ত।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন