স্বপ্ন যখন মানুষকে তাড়া করে, তখন মরুভূমির উত্তাপ কিংবা সাগরের উত্তাল ঢেউ কোনো কিছুই তাকে থামিয়ে রাখতে পারে না।
শেখ মোহাম্মদ রুবেল ঠিক তেমনই একজন মানুষ, যিনি উন্নত জীবনের আশায় নিজের জীবনকে বাজি রেখেছিলেন। তার এই যাত্রা শুরু হয়েছিল পবিত্র ভূমির টানে, কিন্তু শেষ হয়েছে ভূমধ্যসাগরের নোনা জল পেরিয়ে ইতালির আঙিনায়। জমি-গহনা বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা নিয়ে প্রথমে সৌদিআরব হয়ে জর্ডান, তারপর পৌঁছান লিবিয়ায়। নদী পথে ইতালিতে প্রবেশ করেন রুবেল। এরপর লিবিয়া আসার সময় আবার ৮ লাখ টাকা দিতে হয়েছে দালালকে। এখন আবারও দালাল চক্র আরও ৩ লাখ টাকা দাবি করছে। তার ভয়াবহ এই যাত্রাপথ আর কষ্টের কথা বিস্তারিত জানাচ্ছেন মিনহাজুর রহমান নয়ন
উমরাহ ভিসায় মরুর পথে
শেখ রুবেলের যাত্রার প্রথম ধাপটি ছিল আধ্যাত্মিক এবং কৌশলগত। বাংলাদেশ থেকে তিনি প্রথম উড়াল দেন সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে। পাসপোর্টে লাগানো ছিল উমরাহ ভিসা। পবিত্র মক্কা ও মদিনায় উমরাহ পালন শেষে অধিকাংশ মানুষ দেশে ফিরে আসলেও, রুবেলের গন্তব্য ছিল আরও দূরে। সৌদি আরবের তপ্ত মরুভূমির বাতাস তাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে।
পর্যটক বেশে জর্ডান ও তুরস্ক ভ্রমণ
সৌদি আরবের পাট চুকিয়ে তিনি সংগ্রহ করেন টুরিস্ট ভিসা। এরপর তার গন্তব্য হয় জর্ডান। জর্ডানের ঐতিহাসিক আম্মান শহর আর প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনে ঘেরা পথগুলো তাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। কিন্তু রুবেলের মূল লক্ষ্য ছিল ইউরোপের দুয়ার।
জর্ডান থেকে তিনি পাড়ি জমান তুরস্কের ইস্তাম্বুলে। এশিয়া আর ইউরোপের মিলনস্থল এই শহরটি রুবেলের কাছে ছিল এক ট্রানজিট পয়েন্টের মতো। তুরস্কের চোখধাঁধানো সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করলেও তার অবচেতন মনে তখন বাজছিল সাগরের গর্জন। কারণ তিনি জানতেন, আসল সংগ্রামটা এখনো বাকি।
লিবিয়া : অনিশ্চয়তার এক গোলকধাঁধা
তুরস্ক থেকে শেখ রুবেলের পরবর্তী গন্তব্য ছিল উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া। এই দেশটি বর্তমানে অভিবাসীদের জন্য বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক ট্রানজিট রুট হিসেবে পরিচিত। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ-কবলিত পরিবেশ, রুক্ষ মরুভূমি আর দালালদের দৌরাত্ম্যের মাঝে রুবেলকে কাটাতে হয়েছে চরম অনিশ্চয়তার দিনগুলো।
লিবিয়ার ক্যাম্পগুলোতে বসে তিনি প্রহর গুনেছেন কখন আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সেখানে খাবারের কষ্ট, বিশুদ্ধ পানির অভাব আর জীবনের নিরাপত্তার সংকট থাকলেও রুবেল তার সংকল্পে ছিলেন অটল। তার মনে একটাই লক্ষ্য ছিলÑ যেকোনো মূল্যে সাগর পাড়ি দিতে হবে।
ভূমধ্যসাগরের উত্তাল ঢেউ
অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভাষায় সাগর পাড়ি দেওয়াকে বলা হয় ‘গেম’। লিবিয়ার উপকূল থেকে একটি ছোট রাবার বা কাঠের নৌকায় যখন রুবেল এবং আরও কিছু অভিবাসী সাগরে ভাসলেন, তখন তাদের সামনে ছিল কেবল দিগন্তজোড়া পানি আর মাথার ওপর খোলা আকাশ।
ভূমধ্যসাগরের এই পথটি পৃথিবীর অন্যতম মৃত্যুফাঁদ। ছোট্ট নৌকায় গাদাগাদি করে বসে থাকা মানুষগুলোর চোখে ছিল একদিকে ভয়, অন্যদিকে এক বুক আশা। রুবেল বর্ণনা করেন সেই সময়ের কথা, ‘সাগরের ঢেউ যখন নৌকায় আছড়ে পড়ত, তখন মনে হতো এই বুঝি শেষ মুহূর্ত। কিন্তু আল্লাহর নাম আর পরিবারের হাসিমুখের কথা মনে করে সাহস ধরে রেখেছিলাম।’
ইতালির তীরে স্বপ্নের পদচিহ্ন
দীর্ঘ ঘণ্টার উৎকণ্ঠা আর লোনা জলের ঝাপটা পেরিয়ে যখন ইতালির উপকূল দেখা দিল, তখন রুবেলের চোখে জল। ল্যাম্পেডুসা বা সিসিলির কোনো এক তীরে যখন তিনি পা রাখলেন, তখন পেছনে ফেলে এসেছেন হাজার হাজার মাইলের ক্লান্তি আর পাঁচটি দেশের সীমানা।
বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব, জর্ডান, তুরস্ক, লিবিয়া হয়ে সাগরপথে অবশেষে ইতালির মাটিতে দাঁড়িয়ে শেখ রুবেল বুঝতে পারলেন মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।
এক নতুন জীবনের শুরু
ইতালিতে পৌঁছানোর পর শেখ রুবেলের সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি, বরং শুরু হয়েছে নতুন আঙ্গিকে। সেখানে নতুন ভাষা শেখা, আইনি কাগজপত্র গোছানো এবং কর্মসংস্থানের খোঁজে তিনি এখন ব্যস্ত। তবে তার এই দীর্ঘ যাত্রার গল্প এখন অনেকের কাছে বিস্ময়ের খোরাক।
সৌদি আরবের উমরাহ থেকে শুরু করে লিবিয়ার সাগর পাড়ি দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ছিল এক একটি জীবনযুদ্ধ। রুবেল প্রমাণ করেছেন, লক্ষ্য যদি স্থির থাকে তবে মানচিত্রের কোনো বাধাই মানুষকে আটকে রাখতে পারে না।
শেখ রুবেলের এই কাহিনি কেবল একজন মানুষের দেশান্তরের গল্প নয়; এটি টিকে থাকার লড়াই, এটি সাহসিকতার এক অনন্য দলিল। যারা আজ ইউরোপের রাস্তায় তাকে দেখেন, তারা হয়তো জানেন না এই হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে পাঁচটি দেশের মরুভূমি আর সাগরের নোনা জলের ইতিহাস।
শেখ রুবেলের এই যাত্রা সফল হোক, ইতালির নতুন জীবনে তিনি খুঁজে পান তার কাঙ্ক্ষিত সুখ ও সমৃদ্ধি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন