বেশ কয়েকটি ইস্যুতে বিক্ষোভে উত্তাল গোটা ভারত। বিক্ষোভকারীদের হাতে জাতীয় পতাকা, মুখে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে পুলিশের ব্যারিকেড, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ব্যবহারের সঙ্গে চলছে ধর-পাকড়। এমন আবহেই দেশের সাংস্কৃতিক জগতের বহু মানুষ নীরব না থেকে রাস্তায় নামা তরুণদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিশেষ করে বলিউডের একাধিক শিল্পী, সংগীতশিল্পী ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের প্রতি জানিয়েছেন সংহতি।
কেউ সামাজিক মাধ্যমে বার্তা দিয়েছেন, কেউ নিজেদের অনুষ্ঠান বাতিল করেছেন, কেউ আবার পুলিশি পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন সরাসরি। অন্যদিকে, ইন্ডাস্ট্রির বহু বড় মুখ এখনো পর্যন্ত নীরব। আর সেই নীরবতাও এখন জনপরিসরে আলোচনার বিষয়। ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সংগীতশিল্পী অরিজিৎ সিং-এর বার্তা। খুব সংক্ষিপ্ত অথচ আবেগঘন সেই পোস্টে তিনি লিখেন, ‘আমাদের দেশের তরুণরা অমর। ঈশ্বর তাদের শক্তি দিন।’
আন্দোলনরত হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর কাছে এই বার্তা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সমর্থন। কারণ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পীদের একজন যখন যুব সমাজের পাশে দাঁড়ান, তখন সেই বার্তার প্রভাবও বহু গুণ বেড়ে যায়।
অরিজিতের পরেই সামনে আসে হানি সিং-এর অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার বিনোদন জগতের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ হিসেবে পরিচিত এই র্যাপার ও সংগীতশিল্পী শুধু সমর্থনের বার্তাই দেননি, নিজের নতুন গান ‘মুনলাইটের’ টিজার প্রকাশও স্থগিত করেন। তার বক্তব্য ছিল, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তরুণদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানোই বেশি জরুরি।
সংহতি প্রকাশ করেছেন গায়ক আরমান মালিকও। গতকাল ছিল তার জন্মদিন। বিশেষ এই দিনেই নতুন গান প্রকাশ পাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু আন্দোলনের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে গান প্রকাশ করেননি তিনি।
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরাসরি সংহতি প্রকাশ করেন প্রবীণ অভিনেত্রী শাবানা আজমি, অভিনেতা-পরিচালক প্রকাশ রাজ, কৌতুকশিল্পী কুনাল কামরা এবং অভিনেত্রী স্বরা ভাস্কর। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার পক্ষে সওয়াল করেন তারা। শাবানা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন, অনশনরতদের পাশে বসেন। প্রকাশ রাজও মঞ্চে উঠে বলেছেন, ‘আমি আপনাদের সঙ্গেই আছি।’
এই তালিকায় আরও উল্লেখযোগ্য নাম দিলজিৎ দোসাঞ্জ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ছাত্রদের সঙ্গে এমন আচরণ হওয়া উচিত ছিল না। এমন মন্তব্যের জন্য তাচকে আবারও ‘দেশবিরোধী’ বলা হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবু নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তার বক্তব্য, মতপ্রকাশের অধিকার কোনো সরকারের দয়া নয়, তা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।
চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলনে সংহতি জানাতে রাজপথে সরব হয়েছেন অভিনেত্রী পুনম পা-ে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি সবাইকে এ ইস্যুতে রাজনীতি না করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দাবি গুরুত্ব দিয়ে শোনারও অনুরোধ করেন এই অভিনেত্রী।
পুনম বলেন, ‘আমি এখানে শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য এসেছি। রাজনীতি করতে আসিনি, রাজনীতি সম্পর্কেও আমার কোনো মন্তব্য নেই। আমি চাই, শিক্ষার্থীদের দাবি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হোক। অনেক শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। তাই আমি সবাইকে অনুরোধ করব, দয়া করে এই বিষয়টি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিতর্কে পরিণত করবেন না। এটি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন, তাই তাদের কথা শোনা উচিত।’
পুলিশের কথিত লাঠিচার্জের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলিউড অভিনেত্রী সোনাক্ষী সিনহা। সামাজিক মাধ্যমে বিক্ষোভের কয়েকটি ছবি শেয়ার করে তিনি ঘটনাটি নিয়ে কথা বলেন। সোনাক্ষী লেখেন, ‘২০ জুলাই অনেক মানুষের হাড় ভেঙেছে, আর ভেঙেছে পুরো দেশের হৃদয়। এটা মনে রাখবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা পুরো সময় শান্তিপূর্ণভাবে, সম্মান বজায় রেখে এবং কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়াই নিজেদের দাবি তুলে ধরেছেন। দেশের শক্তি যে তরুণদের মধ্যেই রয়েছে, তা তাদের দেখেই বোঝা যায়। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা যেভাবে নিজেদের বিশ্বাসে অটল থেকেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জের ঘটনায় দিল্লি পুলিশকে ‘গুন্ডা’ বলেছেন বলিউড অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ। ভিডিও বার্তায় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই অভিনেতা বলেন, ‘যদি একজন অজ্ঞ ব্যক্তি এই দেশের নেতৃত্ব দেয়, তাহলে সে চাইবে পুরো দেশও তার মতো অজ্ঞ, অবিবেচক, অযোগ্য ও নির্মম হয়ে উঠুক।’
লাঠিচার্জের প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি খুব মর্মাহত। আমাদের সন্তানদের সঙ্গে যেভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে, তা দেখে আমি রাগে ফুঁসছি। এসব গুন্ডাদের দেখে আমার যুক্তরাষ্ট্রের আইসিই এজেন্টদের কথা মনে পড়ে। যাদের মুখে মুখোশ, হাতে লাঠি। এটাও মনে রাখুন, একদিন আপনাদেরও নিজেদের কাজের পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।’
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে নাসিরুদ্দিন শাহ বলেন, ‘আমি তরুণ-তরুণীকে বলতে চাই, তোমরা সাহস হারিও না। অনেক মানুষের সহানুভূতি তোমাদের সঙ্গে আছে। অনেক মানুষ তোমাদের পাশে রয়েছে। তোমরা লড়াই চালিয়ে যাও। আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের ওপর আমার সব সময়ই আস্থা ছিল। এখন সেই আস্থা আরও দৃঢ় হয়েছে। তোমরা তোমাদের ন্যায্য লড়াই চালিয়ে যাও। আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি।’
সরকারের উদ্দেশে বার্তা দেন অভিনেত্রী প্রীতি জিনতা। তিনি ভারতে থাকেন না। বিয়ের পর লস অ্যাঞ্জেলেসে সংসার পেতেছেন প্রীতি। যদিও ভারতে যাতায়াত লেগেই রয়েছে তার। প্রীতি সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়ে লেখেন, ‘আশা করব, এবার সরকার ছাত্রদের সঙ্গে ও সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে ফলপ্রসূ কিছু কথাবার্তা বলতে শুরু করবে, যাতে তাদের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ না হয়।’
পাশাপাশি দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সোনমকে অনুরোধ করেন, ‘আপনি দয়া করে অনশন ভাঙুন। এই লড়াইটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই আপনার সুস্থ থাকাটা দরকার। আপনি এবং আমাদের ছাত্রেরা দেশের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করছে। যারা এই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য লড়াইটা করছেন, তাদের সবার প্রতি আমার ভালোবাসা রইল।’
বাংলা মেগা-সিরিজের অন্যতম পরিচিত মুখ স্বস্তিকা দত্ত। সমাজমাধ্যমে খুবই সক্রিয় অভিনেত্রী। যে কোনও বিষয়ে নিজের স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করেন। ‘স্পষ্টভাষী’ স্বস্তিকা দিল্লির ঘটনায় চুপ থাকতে পারেননি। সমাজমাধ্যমে সেই মর্মান্তিক মুহূর্তের কোলাজ শেয়ার করে লিখেন, ‘সময়ের অপেক্ষা।’ আরেকটি পোস্টে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কাল আরো মার তাই না?’
ইন্ডাস্ট্রির আরও এক প্রতিবাদী অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র। দিল্লির ঘটনায় ক্ষোভ উগরে দিয়ে লিখেছেন, ‘চারপাশের সবকিছু দেখে আমি ক্লান্ত। অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা, ভ-ামি, আর মানুষের একের পর এক অন্যায় যা আমাদের সবাইকে ক্রমশ অধঃপতনের পথে ঠেলে দিচ্ছে। আমার শুধু ইচ্ছে করে কোনও এক গাছের ছায়ায় মাথা রেখে চিরদিনের মতো বিশ্রাম নিই। এই ঘৃণা ও হিংসায় ভরা পৃথিবীকে দেখার জন্য আর কখনও চোখ না খুলি। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছে আমার একটাই প্রার্থনা আমাকে এই সবকিছু থেকে মুক্তি দিন। অবশেষে যেন আমি শান্তিতে বিশ্রাম নিতে পারি।’
প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর শুধু সংগীতজগতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বলিউডের প্রবীণ এবং সমকালীন শিল্পীদের একটি বড় অংশও প্রকাশ্যে সরব হয়েছেন। শাবানা আজমি, প্রকাশ রাজ, দিয়া মির্জা, হুমা কুরেশি, বির দাস, সোনু সুদ, সোহা আলি খান, অদিতি রাও হায়দরি, রীতেশ দেশমুখ, জেনেলিয়া দেশমুখ, আলি ফজল, ফাতিমা সানা শেখ, নাফিসা আলি, সোনি রাজদান, স্বানন্দ কিরকিরেসহ একাধিক শিল্পী ছাত্রদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। তাদের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জবাব কি লাঠিচার্জ হতে পারে?

