সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের বিধ্বংসী প্রভাব এবার সরাসরি আঘাত হেনেছে কৃষকের গোয়ালঘরে। স্বপ্নের বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই গবাদি পশুর প্রধান খাদ্য খড় নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন হাজারো কৃষক। ঘরে ধান না ওঠার পাশাপাশি সংরক্ষিত খড় পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গোখাদ্যের এমন তীব্র অভাব তৈরি হয়েছে যে, বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক তাদের প্রিয় গরুগুলো পানির দরে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
উপজেলার বিভিন্ন হাওরপাড়ের গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায় এক মানবেতর দৃশ্য। চারদিকে পচা খড়ের উৎকট গন্ধ। কৃষকেরা নিরুপায় হয়ে পচে যাওয়া কালো খড় রাস্তার পাশে শুকানোর চেষ্টা করছেন, যদি কোনোভাবে গবাদি পশুকে তা খাওয়ানো যায়। কিন্তু এসব খড় শুকিয়েও খুব একটা লাভ হচ্ছে না, কারণ পচা গন্ধের কারণে পশুরা তা মুখে তুলছে না। ফলে বছরের বাকি সময় গরুকে কী খাওয়াবেন, সেই আশঙ্কায় গোয়াল খালি করছেন গৃহস্থরা।
নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক এমদাদ মিয়া বলেন, ধান তো পানির নিচে শেষ হয়ে গেল, এখন খড়ও রইল না। গরু রাখলে খাওয়াব কী? ক্ষুধার্ত পশুর ডাক সহ্য করা যায় না। তাই বুক ফেটে গেলেও বাধ্য হয়ে ১ লাখ টাকার গরু ৮৫ হাজারে বিক্রি করেছি।
একই করুণ দশা আনোয়ারপুর গ্রামের হোসেন মিয়ারও। তিনি জানান, সারা বছর লাভের আশায় গরু লালন-পালন করলেও এখন খড় না থাকায় পশু বাঁচিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়েছে। বাজারে একসঙ্গে অনেক কৃষক গরু নিয়ে আসায় পাইকারেরা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দিয়েছেন।
উজানচর ও বংশীকু-া এলাকার সড়কের পাশে খড় শুকাচ্ছিলেন কৃষক জয়নাল আবেদীন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিন একর জমির ফসল ডুবেছে। খড়ের অবস্থা তো দেখছেনই, পুরো বিষ হয়ে গেছে। ৯০ হাজার টাকা দামের তিনটি গরু মাত্র ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। শুধু আমি নই, আমাদের পুরো গ্রামের সবার একই অবস্থা। গোখাদ্যের এই সংকট আমাদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ বিষয়টিকে জাতীয় সংকট হিসেবে দেখছেন। মধ্যনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল বাশার বলেন, হাওরপাড়ের অনেক কৃষক এখন দিশাহারা। কেউ নৌকায় করে গরু বাজারে নিয়ে বিক্রি করছেন। কারণ তাদের খাওয়ানোর ক্ষমতা নেই। দ্রুত সরকারিভাবে গোখাদ্য বরাদ্দ এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ না দিলে আগামী মৌসুমে কৃষকেরা মেরুদ- সোজা করে দাঁড়াতে পারবেন না।
বংশীকু-া দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, বর্তমানে গোখাদ্যের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে গরু ধরে রাখলে আরও লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। ঠিকমতো খাবার না পেলে গরুর ওজন কমে যাবে এবং পরে আরও কম দামে বিক্রি করতে হবে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. রাকীব মাহমুদ মাসুম বলেন, ‘এখনো উপজেলায় বড় ধরনের গোখাদ্যের সংকট তৈরি হয়নি। তবে কোরবানির ঈদ সামনে থাকায় অনেক কৃষক আগেভাগেই গরু বিক্রি করছেন বলে আমরা ধারণা করছি।’

