ঢাকার ধামরাইয়ে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন পথ রুদ্ধ করার ফলে এক ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদি কৃষি বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। উপজেলার সোমভাগ ইউনিয়নে প্রায় ৫ হাজার একর ফসলি জমি বছরের পর বছর ধরে পানির নিচে তলিয়ে আছে। শিল্পকারখানার মালিকদের খামখেয়ালিপনা, খালের জমি দখল এবং প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতায় সৃষ্ট এই ‘কৃত্রিম বন্যায়’ অন্তত ১০টি গ্রামের কয়েক হাজার কৃষক পরিবার এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে। এক সময়ের তিন ফসলি শস্যভা-ারখ্যাত এই বিস্তীর্ণ এলাকাটি বর্তমানে কচুরিপানা আর পচা বিষাক্ত পানির বিলে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে সোমভাগ ইউনিয়নের উত্তর জয়পুরা, ডাউটিয়া ও সোমভাগ গ্রামের পশ্চিমাঞ্চলে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। মাইলের পর মাইল কৃষিজমি জলাবদ্ধ হয়ে জনপদের বুক চিঁড়ে বিশাল এক হ্রদের আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় কৃষকদের চোখে-মুখে এখন কেবলই অন্ধকার। এক সময় এই মাঠে ঋতুভেদে আমন-বোরো ধান, পাট ও সরিষার বাম্পার ফলন হতো। ধামরাইয়ের কৃষি অর্থনীতিতে এই অঞ্চলের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। অথচ এখন সেখানে কেবল থৈ থৈ পানি আর পচা দুর্গন্ধ।
স্থানীয় প্রবীণ কৃষক মো. রহুল আমিন আক্ষেপ করে বলেন, আগে আমরা এই জমি থেকে সরিষা তুলে ধান লাগাতাম, কেউ কেউ পাট চাষ করত। পরিবারের সারা বছরের খোরাকি এই জমি থেকেই আসত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আমাদের জমি বিল হয়ে গেছে। চাষাবাদ তো দূরের কথা, জমিতে পা রাখারও উপায় নেই। আমরা এখন কৃষক থেকে দিনমজুরে পরিণত হয়েছি।
আরেক কৃষক জালাল মিয়া জানান, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ‘গাজিখালী’ খালটি ছিল এই অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের প্রধান ধমনি। কিন্তু বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সেই খালটি আংশিক বা সম্পূর্ণ দখল করে কারখানা বাড়িয়েছে, সংযোগ সড়ক নির্মাণ করেছে এবং বর্জ্য ফেলে ভরাট করে ফেলেছে। ফলে বৃষ্টির পানি বা কারখানার বর্জ্য মিশ্রিত পানি নিষ্কাশনের কোনো প্রাকৃতিক পথ অবশিষ্ট নেই।
অভিযোগের আঙুল উঠেছে স্থানীয় বেশ কিছু প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর দিকে। তারা অপরিকল্পিতভাবে ফসলি জমির মাঝে মাটি ভরাট করে পানিপ্রবাহের ঢাল পরিবর্তন করে দিয়েছে। শুধু শিল্প-কারখানাই নয়, কিছু অসাধু স্থানীয় ব্যক্তি খালের জায়গায় বাঁধ দিয়ে কৃত্রিমভাবে মাছ চাষ করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সোমভাগ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কলকারখানার মালিকরা নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের পেটে লাথি দিয়েছেন। তারা ড্রেনেজ ব্যবস্থা না করেই বড় বড় স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। আমরা বার বার দাবি জানালেও কোনো কাজ হয়নি। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ধামরাইয়ের এই কৃষি অঞ্চলটি স্থায়ীভাবে মরুভূমি অথবা ভাগাড়ে পরিণত হবে।
সোমভাগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আবুল হোসেন মনে করেন, এই ৫ হাজার একর জমি উদ্ধার করা গেলে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব। তিনি দ্রুত অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে খালের নাব্য ফিরিয়ে আনার জন্য উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান জলাবদ্ধতার ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেন, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও খাল দখলের কারণেই আজ হাজার হাজার কৃষক ভূমিহীনদের মতো জীবন কাটাচ্ছেন। কৃষি জমি নষ্ট করে শিল্পায়ন কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি এবং একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি প্রতিবেদন তৈরি করছি।
স্থানীয়দের দাবি, ধামরাইয়ের এই বিশাল জনপদকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা এখন কেবল কৃষকের দাবি নয়, এটি পরিবেশগত অস্তিত্বের প্রশ্ন। শিল্পায়ন অবশ্যই দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন, কিন্তু তা কৃষিকে বলি দিয়ে নয়। এ কারণে সরকার যেন অবিলম্বে ‘গাজিখালী’ খালটি দখলমুক্ত এবং একটি আধুনিক ড্রেনেজ-ব্যবস্থা চালু করে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল-মামুন জানান, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশের প্রধান নিষ্কাশন খালটি বর্তমানে মৃতপ্রায়। তিনি বলেন, এটি উদ্ধার ও পুনঃখননের জন্য কেবল স্থানীয় উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, একটি বড় সরকারি প্রকল্পের প্রয়োজন। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করছি। কৃষকদের ফসলি জমি রক্ষায় খালের সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে আমরা শীঘ্রই অভিযানে নামব।

