× UCB Sticker Card
সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

হাসানুজ্জামান হাসান, লালমনিরহাট

প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৭:০৭ এএম

সীমান্তে মাদকের বিষাক্ত ছোবল

হাসানুজ্জামান হাসান, লালমনিরহাট

প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৭:০৭ এএম

সীমান্তে মাদকের বিষাক্ত ছোবল

উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটে মাদকের ভয়াল থাবা প্রতিদিন আরও দীর্ঘ হচ্ছে। ভারত থেকে চোরাই পথে আসা বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় সিরাপ, ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইনের সহজলভ্যতায় জেলাজুড়ে এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। ভারতের সীমান্তঘেঁষা অন্তত নয়টি জেলায় গড়ে ওঠা মাদকের কারখানাগুলো থেকে বাংলাদেশে নিয়মিত পাচার করা হচ্ছে এসব মরণনেশা। বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি থাকা সত্ত্বেও মাদকের এই ভয়াবহ অনুপ্রবেশ যেন কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।

ভারতের সঙ্গে লালমনিরহাটে প্রায় ২৪৮ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করছে লালমনিরহাট-১৫, রংপুর-৫১ ও রংপুর-৬১ বিজিবির তিস্তা-টু এর সদস্যরা। সীমান্তের এই তিনটি সেক্টরের অধীনে থাকা কমপক্ষে অর্ধশত স্পট দিয়ে আসছে ফেনসিডিল, গাঁজা, মদ ও ইয়াবাসহ ইত্যাদি।

সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের তথ্যমতে, সীমান্তের অন্তত ২৬টি রুট মাদক চোরাকারবারিদের জন্য নিরাপদ করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে পাটগ্রামের জোংরা, জগৎবেড়, নাজির গোমানি ও বুড়িমারী; হাতীবান্ধার বড়খাতা, সানিয়াজান, গোতামারী, দৈখাওয়া, জাওরানি, বনচৌকি ও ভেলাগুড়ি; কালীগঞ্জের শিয়ালখাওয়া, গোড়ল ও চন্দ্রপুর; এবং সদরের মোগলহাটসহ অর্ধশত স্পট মাদক কারবারিদের দখলে।

স্থানীয়রা জানান, দিনের আলোর চেয়ে রাতের আঁধারেই এসব সীমান্ত পয়েন্টে মাদক আসার হার বেশি থাকে। চোরাকারবারিরা মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস ও থ্রি-হুইলার ব্যবহার করে সুকৌশলে কিশোর-তরুণদের মাধ্যমে মফস্বলসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসব মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে।

সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দা মনিরুজ্জামান বলেন, প্রতিদিন সীমান্তে বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, থ্রি-হুইলারসহ নানা যানবাহনে চড়ে সুকৌশলে তরুণ, যুবক, কিশোর, যুবতীরা ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা, মদ, সেবন করতে ছুটে আসে। রাত হলেই গোটা সীমান্তের নোম্যানসল্যান্ড চোরাকারবারিদের দখলে চলে যায়।

মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। এর মধ্যে ১ কোটি সরাসরি মাদকাসক্ত এবং বাকি ৫০ লাখ মাঝে-মধ্যে সেবনকারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের ৮০ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারীর বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ দেশের কর্মক্ষম যুবসমাজ। পাশাপাশি নারী মাদকসেবীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং মাদক চোরাচালানের কাজে শিশু ও নারীদের ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ভয়ংকর করে তুলেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আগের সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যে সিন্ডিকেট মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত, তাদের বড় একটি অংশ এখনো সক্রিয় এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পাড়া-মহল্লায় মাদক সহজলভ্য হওয়ায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নেশার জালে জড়িয়ে পড়ছে। মাদকের টাকার জোগান দিতে গিয়ে এলাকায় চুরি, ছিনতাই, অসামাজিক কার্যকলাপ এমনকি ছোটখাটো সংঘর্ষও নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অভিভাবকদের মতে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন।

সীমান্ত এলাকার মশিউর রহমান বলেন, এলাকায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে।  মাদক সহজলভ্য হওয়ায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এ কারণে চুরি-ছিনতাই বেড়ে গেছে। প্রতিদিন সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ফেনসিডিল, হেরোইন ও গাঁজা দেশের অভ্যন্তরে ঢুকছে। ভারত থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ে এসে প্রথমে সীমান্তের গ্রামগুলোতে জড়ো করা হচ্ছে। পরে সুযোগ বুঝে সেগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আবার সুযোগ বুঝে সেগুলো বিভিন্ন যানবাহনে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো চালানসহ বহনকারীদের আটক করলেও মূল হোতা বা গডফাদাররা বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাদক ব্যবসায়ীদের এই শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারায় মাদক নির্মূল করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, অভিযানে ধারাবাহিকতা থাকলেও মূল হোতাদের বিচারের আওতায় না আনা পর্যন্ত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি সামাজিকভাবে মাদকবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে মাদক ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয় না দেখে আইনের কঠোর আওতায় আনতে হবে। অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব এবং বিজিবিকে আরও সমন্বিতভাবে মাঠে নামতে হবে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের মাঝে মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং তাদের জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা না গেলে এই জনপদকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এ বিষয়ে লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, দেশের যুবসমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে বিজিবি সর্বদা সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে। সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে আমরা গোয়েন্দা নজরদারি ও নিয়মিত টহল কার্যক্রম জোরদার করেছি। আমাদের এই অভিযান চলমান থাকবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!