ময়মনসিংহের ফুলপুরে ব্যাংক ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে সর্বস্বান্ত করার এক ভয়াবহ প্রতারণার জাল বিস্তার করেছেন খলিলুর রহমান ম-ল নামে এক ব্যক্তি। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে গ্রামের সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন স্বাক্ষরিত ফাঁকা চেক। পরবর্তীতে তুচ্ছ কারণে বা জমি নিয়ে সামান্য মতবিরোধ হলেই সেই চেক ব্যবহার করে আদালতে মিথ্যা মামলা ঠুকে দিয়ে আদায় করছেন মোটা অংকের অর্থ। খলিলের এই জালিয়াতি ও প্রতারণায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন অনেক পরিবার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বাওলা ইউনিয়নের চন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা নেওয়াজ শরীফ ও তার বিধবা মা নুরেছা বেগম সংসার চালানোর মতো ন্যূনতম সামর্থ্য হারিয়ে ঋণের পথে পা বাড়ান। ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট খলিলের মাধ্যমে তারা কৃষি ব্যাংক থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। ঋণ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে খলিল তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঘুস নেন এবং ব্যাংকে জমা দেওয়ার কথা বলে তিনটি ব্ল্যাঙ্ক চেক হাতিয়ে নেন। কিন্তু কিছুদিন পর জিয়উর রহমান নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে খলিলের জমি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে খলিল কৌশলে ওই চেক ব্যবহার করে মা-ছেলের বিরুদ্ধে ৭ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলা দায়ের করেন।
ভুক্তভোগী নেওয়াজ শরীফ বলেন, ‘মামলার বিবরণীতে খলিল দাবি করেছে, ২০২৩ সালের ১ মার্চ সে আমার বাড়িতে এসে আমাকে ৭ লাখ টাকা ধার দিয়েছে। অথচ ওইদিন আমি আমার কর্মস্থল ঢাকায় ছিলাম, যার অকাট্য প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। খলিলের আসল উদ্দেশ্য হলো মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানি করা এবং মোটা টাকা আদায় করা।’
বিধবা নুরেছা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, ‘বিশ্বাস করে আমরা সব কাগজপত্র তার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। আজ আমরা মাথা গোঁজার ঠাই হারানোর ভয়ে দিন কাটাচ্ছি।’
একইভাবে খলিলের রোষানলে পড়েছেন ষাটোর্ধ্ব আব্দুল খালেক ফকির। তিনি ২০২৪ সালে কৃষি ব্যাংক থেকে সিসি লোন গ্রহণ করলেও খলিলের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে গত ৯ মার্চ তার বিরুদ্ধে ২৭ লাখ টাকার চেক জালিয়াতির মামলা করা হয়। আব্দুল খালেক বলেন, ‘আমি ব্যাংকে চেক জমা দিয়ে ঋণ নিয়েছি, কিন্তু সেই চেক খলিলের হাতে কীভাবে গেল? আমার স্পষ্ট ধারণা, ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই খলিল এই অপকর্ম করছে। এলাকায় অনেকেই তার মাধ্যমে লোন নিয়েছেন এবং সবাই এখন আতঙ্কে আছেন।’
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, খলিল মূলত কৃষি ব্যাংকের একজন পরিচিত দালাল হিসেবে কাজ করেন। জনাব আলী নামে এক ভুক্তভোগী জানান, খলিল তাকে লোন করানোর কথা বলে সাক্ষী হিসেবে তার নাম ব্যবহার করলেও মামলার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
স্থানীয় বওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুব আলম ডালিম বলেন, ‘খলিল একজন চিহ্নিত দালাল। তার মূল টার্গেটই হচ্ছে গ্রামের সহজ-সরল অসহায় মানুষ। মানুষকে ঋণের লোভ দেখিয়ে ফাঁকা চেক রেখে দেওয়া তার দীর্ঘদিনের পেশা। এই প্রতারণার দায় কোনোভাবেই স্থানীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। আমরা প্রশাসনের কাছে এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’
ভুক্তভোগীদের আইনজীবী ও সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর সজীব সরকার রোকন জানান, মামলা দুটি বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছে। সত্য-মিথ্যা আদালতই নির্ধারণ করবে। এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে খলিলের এই প্রতারক চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা না হলে আরও অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খলিলুর রহমান ম-ল নিজেকে একজন সাধারণ গ্রাহক দাবি করে বলেন, ‘আমি ব্যাংকের ভালো গ্রাহক, তাই নিয়মিত যাতায়াত করি। যারা আমার বিরুদ্ধে কথা বলছে, তারা পাওনা টাকা না দেওয়ায় আমি আইনি আশ্রয় নিয়েছি।’
এদিকে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ফুলপুর শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার সাইদুর রহমান বলেন, ‘খলিল আমাদের নিয়মিত গ্রাহক। তবে বর্তমানে ব্যাংকের ভেতরে দালালি করার কোনো সুযোগ নেই।’ তবে কৃষি ব্যাংক ময়মনসিংহ কার্যালয়ের মহাব্যবস্থাপক জামিল আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংক থেকে গ্রাহকের চেক বাইরে যাওয়ার কোনো নিয়ম নেই এবং কৃষি ঋণের বিপরীতে কোনো ফাঁকা চেক জমা রাখার বিধান নেই। খলিলের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি প্রতারিত হয়ে থাকলে এবং ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন