রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের গোপিডাঙ্গা মৌলভীবাজার এলাকার একটি পাকা সেতুর দুপাশের সংযোগ সড়ক বন্যায় ধসে যাওয়ার পর প্রায় এক দশক ধরে বাঁশ ও কাঠের অস্থায়ী সাঁকো দিয়ে চলাচল করছে অন্তত ১০ গ্রামের অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। জরাজীর্ণ সেতু ও নড়বড়ে সাঁকোই এখন তাদের একমাত্র ভরসা। প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগী, চাকরিজীবীসহ হাজারো মানুষ। দীর্ঘদিনেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গোপিডাঙ্গা মৌলভীবাজার এলাকার একমাত্র পাকা সেতুটির একটি অংশ মারাত্মকভাবে হেলে পড়েছে। সেতুর দুপাশের সংযোগ সড়ক তিস্তা নদীর বন্যার পানির তোড়ে বহু আগেই ধসে গেছে। ফলে স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে একটি অস্থায়ী সাঁকো নির্মাণ করে চলাচল করছেন। সময়ের সঙ্গে সেই সাঁকোও এখন নড়বড়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামান্য অসাবধানতাই বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল গোপিডাঙ্গা, মৌলভীবাজারসহ আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ। প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কৃষিপণ্য বহনকারী ভ্যান ও অটোরিকশা, ঘোড়ার গাড়ি এবং সাধারণ পথচারীরা এই সেতু ব্যবহার করেন। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে সবাইকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ৩৭ লাখ ২৪ হাজার ১৮৩ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করে। ওই বছরের জুন মাসে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম মায়া সেতুটির উদ্বোধন করেন। কয়েক বছরের মধ্যেই তিস্তার প্রবল স্রোতে সেতুর উভয় পাশের সংযোগ সড়ক ধসে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সংযোগ সড়ক পুনর্নির্মাণ কিংবা সেতু সংস্কারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে এলাকাবাসী নিজেদের অর্থ ও শ্রমে বাঁশ-কাঠের সাঁকো নির্মাণ করে চলাচলের ব্যবস্থা করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুটির বেহাল অবস্থার কারণে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে কিংবা বর্ষাকালে পারাপার আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জরুরি রোগী পরিবহনেও নানা বিড়ম্বনার সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক সময় যানবাহন ঘুরপথে চলাচল করতে বাধ্য হওয়ায় সময় ও ব্যয়Ñ দুই-ই বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘১০ বছর ধরে আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছি। এত মানুষের দুর্ভোগ হলেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শুধু আশ্বাসই দিয়ে যাচ্ছেন।’
ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাফিজার রহমান বলেন, ‘এই সেতুর ওপর অর্ধলক্ষাধিক মানুষের চলাচল নির্ভরশীল। স্থানীয়ভাবে কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বড় ধরনের অর্থ বরাদ্দ না থাকায় সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হয়নি।’
বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী জানান, জরাজীর্ণ সেতুটি অপসারণ করে নতুন সেতু নির্মাণের জন্য প্রকৌশল দপ্তরে চার থেকে পাঁচবার আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হলেও এখনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন কাউনিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গোপিডাঙ্গা মৌলভীবাজার এলাকায় নতুন একটি সেতু নির্মাণের জন্য ইতোমধ্যে প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। টেন্ডার অনুমোদন হলেই নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।’ এদিকে দ্রুত নতুন সেতু নির্মাণ ও সংযোগ সড়ক পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, বর্ষা মৌসুমে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন