উত্তরবঙ্গের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জের ওমরপুরের কাছে অবস্থিত বাংলার সুলতানি যুগের মুসলিম নিদর্শনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দারসবাড়ি মাদ্রাসা ও মসজিদ। মহানন্দা নদীর তীর ঘেঁষে কিছুদূর পার হলে চোখে পরবে দারসবাড়ি মাদ্রাসা ও মসজিদ।
আরবি দরস বা দারস অর্থ পাঠ, উচ্চারণ শব্দ থেকে আসছে দারাসবাড়ি বা দারাসবাড়ি মসজিদ, মাদ্রাসা। ধারণা করা হয় স্বাধীন বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহের রাজত্বকালে ১৫০২ খ্রিষ্টাব্দে ১ রমজান সুলতানের আদেশে অখ- বাংলার আদি রাজধানী গৌড়ের ফিরোজপুরের দারসবাড়িতে একটি সুবিশাল আবাসিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদ্রাসাটি পাঠক্রম ও অন্যান্য দিক বিবেচনায় ছিল একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়তুল্য। ঠিক তেমনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই দারাসবাড়ি মসজিদ। কিছুটা সামঞ্জস্য থাকায় এই মসজিদ সেই একি সময়ের নির্মাণ বলে ধারণা করা হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায় বাংলাদেশে সন্ধানপ্রাপ্ত সর্বপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হলো এই দারাসবাড়ি।
আরেকটি সূত্র কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত শিলালিপি মোতাবেক মসজিদটি ১৪৭৯ খ্রিষ্টাব্দে শামসুদ্দিন আবুল মুজাফফর ইউসুফ শাহ্ নির্মাণ করান। লোকেমুখে শোনা যায় বিভিন্ন জনপদ থেকে শিক্ষার্থী শিক্ষার জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হতেন সেই সময়ে। এখানেই প্রথম সিহাহ সিত্তাহর সমন্বিত পাঠক্রমের সূচনা হয়। এখানেই মুহাম্মদ বিন ইয়াজদান বখশ নামের একজন বুজুর্গ আলিম নিজ হাতে বুখারি শরিফ লিপিবদ্ধ করেন বলে এমন একটা ইতিহাস লোকেমুখে চলমান এবং তিনিই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন। যদিও ঢাকার সোনারগাঁওয়ে শায়খ শারফুদ্দিন আবু তাওয়ামা ৭০০ শতাব্দীতে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হাদিসের আনুষ্ঠানিক পাঠদান শুরু করেন। দীর্ঘকাল দারাসবাড়িতে মসজিদ, মাদ্রাসা মাটিচাপা অবস্থায় পড়ে ছিল। অনেকটা ভূতুরে গাছগাছালিঘেরা ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে ছিল। সত্তরের দশকের প্রথম ভাগে খনন কাজের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয় দারসবাড়ি মাদ্রাসা, মসজিদ। স্থাপত্যশৈলী দেখে ধারণা করা হয় এটি একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় কমপ্লেক্স। সুপ্রাচীন এই ইসলামী স্থাপত্য নিদর্শনটি ছিল বর্গাকৃতির। সবগুলো বাহুর দৈর্ঘ্য ৫১.৫২ মিটার। কমপ্লেক্সের মাঝামাঝি অংশে ৩৭.৫ মিটার পরিমাপের বর্গাকার চত্বরের পশ্চিম বাহু ছাড়া অপর তিন বাহুতে এক সারি করে প্রকোষ্ঠ এবং তিন বাহুর মধ্যবর্তীতে ছিল তিনটি নামাজের জায়গা বা ইমামের কক্ষ। তিনটি কক্ষেই রয়েছে আলাদা আলাদা তিনটি অবতল মেহরাব। স্থাপনাগুলোর দেওয়াল পোড়ামাটির ফলক ও নকশায় অলংকৃত। দারসবাড়ি কমপ্লেক্সে আরও ৩৭টি কক্ষ ছিল। ছিল ওয়াক্তিয়া মসজিদ একটি, অফিস একটি। ছিল তিনটি প্রবেশপথ। বাহ্যিকভাবে দারসবাড়ি ইসলামী কমপ্লেক্স বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কক্ষ সংখ্যা ৪০টি হওয়ার কারণে, দারসবাড়িকে চল্লিশ ঘর বা চল্লিশ বাড়িও বলা হতো।
দারসবাড়ি মসজিদের কাঠামো এখনো দাঁড়িয়ে থাকলেও ধসে গেছে ছাদ, গম্বুজ ইত্যাদি। নেই নামাজ আদায়ের পরিবেশ। ভগ্ন দেওয়াল ও ভূগর্ভস্থ ভীত প্রমাণ করছে, একদা এ অঞ্চলে ছিল সুশিক্ষিত আধুনিক মুসলিম সভ্যতার সূতিকাগার। ভূকম্পন, অন্য কোনো প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক কারণে হারিয়ে যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব। এই বাংলায় শহিদ-গাজী, দরবেশ, বিজেতা, ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বের আগমনে ইসলাম এই অঞ্চলে গ্রাম, মাঠ প্রান্তরে ছড়িয়ে গেছে। তারা ঘুমিয়ে আছেন এ দেশেরই পবিত্র মাটিতে। এমনি বাস্তবতার সাক্ষী দারসবাড়ি। বর্তমানে বিধ্বস্ত, প্রায় বিলুপ্ত। আমরা কি পারি না, পাঁচ শতাব্দী প্রাচীন চাঁপাইনবাবগঞ্জের দারসবাড়ির ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিচাপা ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড় করাতে নতুন আরেক দারাসবাড়ি মসজিদ, মাদ্রাসা।

