গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এইচ এম মাজহানুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের তথ্য পাওয়া গেছে। কমিশন ছাড়া প্রকল্পের বিলে তিনি স্বাক্ষর করেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রথম পর্যায়ে টিআর ৫৩টি, কাবিটা ৪২টি এবং কাবিখা ২৪টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বরাদ্দকৃত এসব প্রকল্পের কাজ শুরুর জন্য প্রতিটি প্রকল্পের প্রথম কিস্তিতে ৫০ শতাংশ বিলও প্রদান করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ করার নির্দেশনা ছিল গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও অনেক প্রকল্পের কাজ এখনো শুরুই করা হয়নি। কিছু প্রকল্পের কাজ হলেও তা হয়েছে শুধু নামমাত্র। প্রকল্পের পরিপত্র অনুযায়ী, কাজ শুরুর আগে বাধ্যতামূলকভাবে প্রকল্প এলাকায় সাইনবোর্ড টানিয়ে প্রকল্পের নাম, ব্যয়, বাস্তবায়নকারী ও সময়কাল উল্লেখ করার কথা, যাতে জনসাধারণ প্রকল্প সম্পর্কে জানতে ও তদারকি করতে পারে। কিন্তু উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের লোক দেখানো কয়েকটি প্রকল্পে সাইনবোর্ড দেওয়া হলেও বেশিরভাগ প্রকল্প এলাকাতেই সাইনবোর্ডের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এতে স্থানীয়দের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের সাইনবোর্ড না থাকা মানেই সাধারণ মানুষের জানার অধিকার ক্ষুণ্ণ করা এবং স্বচ্ছতা লঙ্ঘন। তা ছাড়া প্রকল্পের তালিকা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করারও নির্দেশনা থাকলেও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে কোনো প্রকল্প তালিকা খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রতিটি প্রকল্প স্থানে অতিদ্রুত সাইনবোর্ড টানানোর বিষয়টি নিশ্চিতকরণসহ প্রকল্পের সব তালিকা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সভাপতিদের হাতে থাকলেও প্রকল্পগুলো নিয়মিত তদারকি করার কথা উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কমিশন বাণিজ্যের কারণে প্রকল্পগুলো তদারকি করেন দায়সাড়াভাবে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পিআইও অফিসে প্রকল্পের বিল জমা দেওয়ার সময় প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে ১০ শতাংশ কমিশনসহ স্টিমেট বাবদ ২ হাজার টাকা, সাইনবোর্ড বাবদ ১ হাজার, মাস্টাররোল বাবদ ২ থেকে ৩ হাজার, স্ট্যাম্প বাবদ ১ হাজার, ব্যাংক বাবদ ২০০, ট্রেজারি বাবদ ৫০০ এবং কোনো প্রকল্পের কাজ না হলে ২৯ শতাংশসহ অডিট বাবদ ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা আদায় করা হয়। এ ছাড়া সরকারি নিয়ম না মেনে প্রকল্পগুলোতে ভ্যাট ও আয়কর বাধ্যতামূলক না থাকলেও সেগুলোর জন্যও পিআইও অফিস প্রতিটি প্রকল্পের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর কেটে নেয়।
অপরদিকে, এইচবিবি করণ পূর্বের কাজ করা থাকলেও ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ভোটমারী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ওই একই রাস্তায় ১০০ মিটার এইচবিবি করণে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজ করা সেই রাস্তাটিরও কমিশনের বিনিময়ে ৫০ শতাংশ বিল প্রদান করেন পিআইও।
অনুসন্ধানের পর বিভিন্ন পত্রিকায় বিষয়টি নিয়ে লেখালেখির পর অবশেষে ১০০ মিটারের পরিবর্তে ২০ মিটার কাজ শুরু করা হলেও বাকি ৮০ মিটারের বরাদ্দের অর্থ পিআইওর পকেটে নাকি অন্য কারও পকেটে গেছে—সে প্রশ্ন থেকেই যায়। উক্ত রাস্তায় কাজ শুরু করার বিষয়টি জানেন না প্রকল্পের সভাপতি।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মাজহানুর রহমানের মোবাইল ফোনে বিকেল ৪টা ৪৮ মিনিট থেকে ৪টা ৫৬ মিনিট পর্যন্ত একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামিমা আক্তার জাহান বলেন, তিনি এ উপজেলায় নতুন যোগদান করেছেন। প্রকল্পের কাজ ১০০ মিটারের পরিবর্তে ২০ মিটার করার বিষয়টি তার জানা নেই এবং কমিশন বাণিজ্যের বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পিআইওর এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তারা ভেবেছিলেন অনিয়ম বন্ধ হবে। কিন্তু বাস্তবে অনিয়ম ও দুর্নীতি আগের মতোই চলছে। এসব অনিয়মের জন্য আদৌ কেউ শাস্তি পাবে, নাকি পুরোনো কাহিনি আবার নতুন করে লেখা হবে—সেই প্রশ্নই এখন সবার।


-20260117203615.webp)
সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন