জ্বালানি সংকট বরিশালেও প্রকট আকার ধারণ করেছে। ডিলার বা পাম্প মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে পদ্মা-মেঘনা এবং যমুনা ওয়েল কোম্পানি। আবার যেটুকু সরকারি এই তিনটি প্রতিষ্ঠান পাম্প এবং ডিলারদের দিচ্ছে, তা বিক্রিতেও বড় ধরনের অনিয়ম হচ্ছে। কীর্তনখোলা নদীর তীরের বিভাগীয় শহর বরিশালে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান পেট্রোল-অকটেন ১৫০–২০০ টাকা মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি শহরের পাম্পগুলোতেও কখনও কখনও জ্বালানি সংকটের অজুহাতে বিক্রি বন্ধ রাখতে দেখা যাচ্ছে। ফলে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা এক ধরনের হয়রানির শিকার হয়ে হতাশায় ভুগছেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বরিশাল বিভাগের ৬ জেলাসহ পার্শ্ববর্তী মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে প্রতিদিনের ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার লিটার, অকটেন ৬০ হাজার লিটার এবং পেট্রোল ২ লাখ ৪০ হাজার লিটার। কিন্তু চাহিদার তুলনায় ২০ শতাংশ কম জ্বালানি সরবরাহ করতে সক্ষম হচ্ছে পদ্মা-মেঘনা এবং যমুনা ওয়েল কোম্পানি। ডিপো থেকে কম প্রাপ্তি এবং জ্বালানি সরবরাহে চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় নেওয়ায় খুচরা বাজারে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি হয়।
ভুক্তভোগী, বিশেষ করে পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পাম্পগুলো জ্বালানি অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করতে না পারলেও প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে সরবরাহ বন্ধ রাখে। এতে শহরের প্রতিটি পাম্পে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভিড় থাকে এবং স্থানীয় অলিগলির কিছু দোকানে বিক্রি হলেও তা নিতে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়। অভিযোগ আছে, এই দোকানিরা মোটরসাইকেল আরোহীদের কাছে প্রতি লিটার অকটেন-পেট্রোল ১৫০–২০০ টাকা পর্যন্ত দাম নিচ্ছেন। ঈদ পূর্বাপর বরিশালের জ্বালানি বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের তদারকির অভাবে এই অনিয়ম চলছে।
তবে পাম্প মালিকেরা বলছেন, সরকার পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানির চাহিদা অধিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পাম্পে গ্রাহকদের ভিড় থাকছে এবং সংকটে পড়ে কখনও কখনও অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিক্রি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
কম জ্বালানি সরবরাহের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পদ্মা ওয়েল পিএলসি বরিশালের সেলস অফিসার শরীফুল ইসলাম মজুমদার। এই কর্মকর্তা জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠান ডিজেল সরবরাহ করে থাকে। গত বছরের মার্চে যে পরিমাণ জ্বালানি বিক্রি করা হয়েছিল, এবারও সেই পরিমাণ পাম্প এবং ডিলারদের দেওয়া হয়েছে। এবং এই জ্বালানি কোথাও অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি বা মজুত করে রাখা হয়েছে কি না, অভিযোগ প্রাপ্তির সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
তাহলে খোলা বাজারে ১৫০–২০০ টাকা দামে কীভাবে বিক্রি হয়—এমন প্রশ্নে শরীফুল ইসলাম বলেন, গুরুতর অভিযোগ পেলে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করা হয়। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক দামে ডিজেল বিক্রির দায়ে তিন দিন আগে, গত ২৬ মার্চ নগরীর পোর্ট রোডের মেসার্স ফারুক এন্টারপ্রাইজকে ১০ হাজার টাকা এবং ১০ লিটার ডিজেলে দেড়শ মিলিলিটার কম দেওয়ায় মেসার্স জিয়া ব্রাদার্সকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এই অনিয়ম রোধে খুচরা বাজার ভোক্তা অধিদপ্তরসহ জেলা প্রশাসন তদারকি করতে পারে, মাঝে মধ্যে করছেও- জানান পদ্মা ওয়েল কোম্পানির এই কর্মকর্তা।
তবে সংকটের মধ্যে জ্বালানি বিক্রিতে মাঠপর্যায়ে এই চৌর্যবৃত্তি বন্ধে বরিশাল জেলা প্রশাসনের তদারকি তেমন লক্ষ্যণীয় নয়। প্রাসঙ্গিক এই বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। অনুরূপভাবে মেঘনা এবং যমুনা ডিপোর কর্মকর্তাদের ফোন করা হলেও তাদের তরফ থেকেও সাড়া মেলেনি।
অবশ্য বরিশালে জ্বালানি সংকট নিয়ে খোদ জেলা প্রশাসক খায়রুল আলমও বেশ বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। শহরের জনৈক ডিলার, আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন আলো এবং জেলা প্রশাসকের জ্বালানি কাণ্ড নিয়ে স্থানীয় পত্রিকায় নেতিবাচক শিরোনাম হয়। এমন প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকট কোথায় গিয়ে ঠেকে তা দেখার বিষয় হলেও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা আছেন দুশ্চিন্তার মধ্যে। পাশাপাশি শহরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা গেছে, কারণ জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ বা দাম বেড়ে গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর প্রভাব পড়ে, হু হু করে বেড়ে যায় সকল পণ্যের মূল্য। ফলে বলা যায়, আমেরিকা–ইসরায়েল এবং ইরানের যুদ্ধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা ভরসা নয়।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন