আজও নিজস্ব ছন্দে বয়ে চলে কুমার নদ। কুমার নদের পাড়ে গড়ে উঠেছে শৈলকুপার ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষি আর মানুষের সংগ্রামের গল্প। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই জনপদের নামের পাশে নীরবে জুড়ে গেছে আরেকটি উদ্বেগের শব্দ— আত্মহত্যা। এমন এক বাস্তবতা, যা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও থানা সূত্রভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচ বছর পাঁচ মাসে উপজেলাটিতে মোট ৪৫২টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নারী ও কিশোরীদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও পুরুষ ও কিশোরদের মধ্যেও উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে আত্মহত্যা করেন ৮৭ জন (কিশোর ৮, কিশোরী ১৪, পুরুষ ৩৮, নারী ২৭)। ২০২২ সালে সংখ্যা ছিল ৬৫ জন (কিশোর ৮, কিশোরী ৮, পুরুষ ২০, নারী ২৯)। ২০২৩ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়ায় ৮২ জন। ২০২৪ সালে ৭৩ জন আত্মহত্যা করেন।
২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৫ জনে। আর ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৪০টি।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ঘটনার মধ্যে কিশোর প্রায় ১২ শতাংশ, কিশোরী ১৪ শতাংশ, পুরুষ ৩৬ শতাংশ এবং নারী ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ সংকটটি নির্দিষ্ট কোনো বয়স বা শ্রেণির নয়- এটি পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণে আত্মহত্যার পেছনে উঠে এসেছে- পারিবারিক কলহ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, প্রেম ও সম্পর্ক ভাঙন, বেকারত্ব, ঋণের চাপ, দাম্পত্য অশান্তি, মাদকাসক্তি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, হতাশা এবং কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক বা জেনেটিক প্রভাব।
এ বিষয়ে শৈলকুপা থানার ওসি হুমায়ুন কবীর মোল্লা বলেন, আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং একটি পরিবারকে দীর্ঘ সময়ের জন্য মানসিক কষ্টের মধ্যে ফেলে দেয়। পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজ যদি সময়মতো পাশে দাঁড়ায়, অনেক ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। তরুণদের কথা শুনতে হবে, তাদের একা ফেলে রাখা যাবে না। কেউ সংকটে থাকলে তাকে বিচার নয়-সহায়তা প্রয়োজন।
শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, আত্মহত্যা শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি সামাজিক ও মানবিক চ্যালেঞ্জ। প্রতিরোধের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব- সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম, কাউন্সেলিং উদ্যোগ এবং সামাজিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করছি। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক যোগাযোগ এবং ইতিবাচক জীবনবোধ তৈরিতে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলা, তাদের মানসিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা এবং সমস্যা হলে দ্রুত পরামর্শ নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সমাজে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ কষ্ট লুকাবে না- কথা বলবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু সচেতনতা নয়- প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ, সহজলভ্য কাউন্সেলিং এবং সহমর্মিতার সংস্কৃতি।
সচেতন মহলের প্রত্যাশা- কুমার নদের পাড়ের এই জনপদ আবার ফিরে পাক তার গর্বের পরিচয়। আত্মহত্যার পরিসংখ্যানে নয়, জীবন, সম্ভাবনা আর মানুষের গল্পেই উচ্চারিত হোক ‘শৈলকুপা’।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন