মানুষের প্রতি ভালোবাসা, আস্থা ও কৃতজ্ঞতার এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. সালমান ওমর। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ভিক্ষা করে জমানো টাকা থেকে তার নির্বাচনি তহবিলে ৭০ টাকা অনুদান দিয়েছিলেন সীমান্তবর্তী এলাকার এক বৃদ্ধা। নির্বাচিত হওয়ার পর সেই ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে নিজের প্রথম মাসের সংসদ সদস্যের সম্মানীর অর্থ দিয়ে ওই বৃদ্ধার জন্য একটি নতুন বসতঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার গাজীরভিটা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী নামছাপাড়া গ্রাম আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে রিনা স্নালের (৭১) কাছে হস্তান্তর করেন সংসদ সদস্য মো. সালমান ওমর। এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও এলাকার বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা নামছাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রিনা স্নালের স্বামী কেন্দ্র তজু কয়েক বছর আগে মারা যান। জীবিত অবস্থায় তিনি বাঁশ ও বেতের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে পরিবার চালাতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে কিছুদিন দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন রিনা স্নাল। তবে বয়সের ভার ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেই কাজও চালিয়ে যেতে পারেননি। একপর্যায়ে জীবিকার তাগিদে তাকে ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভর করতে হয়।
রিনা স্নালের একমাত্র ছেলে শান্ত স্নাল বিয়ের পর আলাদা সংসার গড়ে তোলেন। বর্তমানে তিনি সিরাজগঞ্জে দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি ঘরে একাই মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন রিনা স্নাল। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকত, আর ঝড়-বৃষ্টির সময় আতঙ্ক নিয়েই রাত কাটাতে হতো তাকে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার সময় স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সালমান ওমরের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভিক্ষা করে জমানো টাকা থেকে ৭০ টাকা তার নির্বাচনী তহবিলে দেন রিনা স্নাল। সামর্থ্যের বিচারে ছোট হলেও সেই অনুদান সংসদ সদস্যের কাছে হয়ে ওঠে ভালোবাসা, আস্থা ও বিশ্বাসের এক অনন্য প্রতীক।
বিজয়ী হওয়ার পর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিজের প্রথম মাসের সম্মানীর অর্থ দিয়ে রিনা স্নালের জন্য একটি নতুন বসতঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেন সংসদ সদস্য। অল্প সময়ের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ হলে শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরটি তার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সংসদ সদস্য মো. সালমান ওমর বলেন, ‘নির্বাচনের সময় রিনা স্নাল ভিক্ষা করে পাওয়া টাকা থেকে ৭০ টাকা আমার নির্বাচনি তহবিলে দিয়েছিলেন। অর্থের পরিমাণ নয়, তার আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সংসদ সদস্য হিসেবে পাওয়া আমার প্রথম মাসের সম্মানীর অর্থ দিয়ে তার জন্য একটি নিরাপদ বসতঘর নির্মাণ করব। আজ সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পেরে আমি আনন্দিত।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রিনা স্নালের দেখভাল করার মতো তেমন কেউ নেই। দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কষ্টে ও অনিরাপদ পরিবেশে বসবাস করছিলেন তিনি। নতুন ঘর পাওয়ার পর এখন তিনি নিরাপদ ও স্বস্তিতে থাকতে পারবেন।
তারা বলেন, সংসদ সদস্যের এই মানবিক উদ্যোগ শুধু একটি ঘর নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একজন অসহায় মানুষের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
নতুন ঘর পেয়ে আবেগাপ্লুত রিনা স্নাল বলেন, জীবনের এই বয়সে নতুন ঘরে থাকার সুযোগ পাব, কোনোদিন ভাবিনি। ভিক্ষা করে যে টাকা দিয়েছিলাম, তার এমন প্রতিদান পাব, সেটাও কল্পনা করিনি। যারা আমাকে এই ঘর করে দিয়েছেন, আল্লাহ তাদের ভালো রাখুন। আমি সবসময় তাদের জন্য দোয়া করব।
তিনি আরও বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের ভালোবাসার মর্যাদা দেওয়া আমার দায়িত্ব। সমাজের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারলেই জনপ্রতিনিধিত্ব সার্থক হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন