মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় মনু নদীর বাঁধ ভেঙে চারটি ইউনিয়নের অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নদীর ভাঙনে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এ ঘটনায় স্রোতের টানে পড়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল থেকে জেলাজুড়ে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশ রয়েছে মেঘাচ্ছন্ন। গত তিন দিনে জেলায় ২০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আরও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার প্রধান নদীগুলোর মধ্যে মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর চাঁদনীঘাট এলাকায় পানি বিপৎসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে ধলাই, কুশিয়ারা ও জুড়ী নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
একামধু গ্রামের মকদ্দুস মিয়া ও গিয়াস মিয়া বলেন, “বাড়িতে পানি ওঠায় আমরা মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে আশ্রয় নিয়েছি। ছেলে-সন্তানদের নিয়ে থাকার জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে এখানে আশ্রয় নিতে হয়েছে।”
কান্দিরকুল গ্রামের পৃথ্বী রানী ও খায়রুন বেগম বলেন, “বাঁধ ভেঙে আমাদের বসতবাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। গবাদিপশু ও জরুরি জিনিসপত্র নিয়ে আমরা এখানে আশ্রয় নিয়েছি।”
এদিকে, গতরাতে মনু নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙনের কারণে বাড়ির সামনের রিং বাঁধ ভেঙে গেলে পানির স্রোতে পড়ে মারা যান ৭০ বছর বয়সী আশরাফ আলী আসই। তিনি রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয়রা জানান, বাঁধ ভাঙার পর আশরাফ আলী নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শুক্রবার সকালে বাড়ির পাশের পানির স্রোতে তার মরদেহ ভেসে ওঠে। পরে স্থানীয়রা মরদেহ শনাক্ত করে পরিবারের সদস্যদের খবর দেন।
এলাকার বাসিন্দা মজনু মিয়া বলেন, “হঠাৎ ভাঙনের কারণে মানুষকে উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসতে পারেনি। রাতের আঁধারে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা চরম দুর্ভোগে পড়েছিলেন। আশরাফ আলী তাড়াহুড়া করতে গিয়ে বানের স্রোতে ভেসে যান।”
টেংরা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন বলেন, “বানের পানিতে ডুবে বৃদ্ধ আশরাফ আলীর মৃত্যু হয়েছে। রাস্তাঘাট জলমগ্ন থাকায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তবে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে।”
রাজনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফরিদ উদ্দিন আহমদ ভুইঁয়া বলেন, “খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, অসাবধানতাবশত পানিতে পড়ে গিয়ে ওই বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।”
এদিকে, অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে পাশের জেলা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় সুরমা নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সম্ভাব্য বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২৪ ঘণ্টার বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সুরমাসহ পার্শ্ববর্তী নদ-নদীর পানি আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে অন্তত ১৮ জেলার বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে অথবা বিদ্যমান পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।
এফএফডব্লিউসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সাঙ্গু নদী বান্দরবান ও দোহাজারী, মাতামুহুরী নদী লামা ও চিরিঙ্গা, মনু নদী মনু রেলওয়ে ব্রিজ ও মৌলভীবাজার, ধলাই নদী কমলগঞ্জ, খোয়াই নদী বাল্লা ও হবিগঞ্জ এবং কুশিয়ারা নদী মারকুলী স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন