টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে হবিগঞ্জের খোয়াই নদী ও মৌলভীবাজারের মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ৪৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। কোথাও কোথাও বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো পৃথক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জে ২৫ গ্রাম প্লাবিত
হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাতে সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। এতে দ্রুতগতিতে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি প্রবেশ করে।
বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাঁও, নতুন বাজার, বালিহাটা, কালীগঞ্জ, যাদবপুর, বিষ্ণুরামপুর, দক্ষিণচর, রামনগর ও বনদক্ষিণসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে। অনেক পরিবারের ঘরে কোমরসমান পানি উঠেছে।
হঠাৎ বন্যার পানিতে দুর্ভোগে পড়া মানুষজন গবাদিপশু, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছেন। অনেকে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিয়েছেন।
এদিকে হবিগঞ্জ শহরের কামড়াপুর ও দানিয়ালপুর এলাকার কয়েকটি বাসাবাড়িতেও পানি ঢুকেছে। পানি বৃদ্ধির কারণে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদীভাঙনও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে হরিজন সম্প্রদায়ের রবিদাস পাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়েছে।
খোয়াই নদীর মাছুলিয়া পয়েন্টে শহর রক্ষা বাঁধও ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয়রা বাঁশসহ বিভিন্ন উপায়ে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছেন। তাদের অভিযোগ, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভাঙনের ঝুঁকি বেড়েছে।
বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মঈনুক হক জানান, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। জরুরি ব্যবস্থার জন্য ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল ও শুকনো খাবার মজুত রাখা হয়েছে।
মনু নদীর বাঁধ ভেঙে মৌলভীবাজারে ৩০ গ্রাম প্লাবিত
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে চারটি ইউনিয়নের অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বাঁধ ভাঙনের সময় পানির স্রোতে পড়ে ৭০ বছর বয়সী আশরাফ আলী আসই নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তিনি রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয়রা জানান, মনু নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর আশরাফ আলী নিরাপদ স্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পরে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শুক্রবার সকালে বাড়ির পাশের পানির স্রোতে তার মরদেহ ভেসে ওঠে।
মনু নদীর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, চাঁদনীঘাট এলাকায় নদীর পানি বিপৎসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
প্লাবিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় অনেকে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়েও অনেকে সেখানে অবস্থান করছেন।
সুনামগঞ্জেও বাড়ছে বন্যার শঙ্কা
অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় সুরমা নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের অন্তত ১৮ জেলার বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে সাঙ্গু, মাতামুহুরী, মনু, ধলাই, খোয়াই ও কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন