সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বগুড়াজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোক ও বিষাদের ছায়া। যিনি ছিলেন এ জনপদের পুত্রবধূ, রাজনীতির বাইরে যাকে মানুষ আপনজন হিসেবেই চিনত—সেই ‘ব্যাটার বউ’কে হারিয়ে শোকাহত বগুড়ার মানুষ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি ও বাঘবাড়ি এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল থেকেই শোকাহত মানুষের ঢল নামে। খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় গাবতলীর বাগবাড়িতে আয়োজন করা হয় বিশেষ দোয়া মাহফিল। স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষ, বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ সেখানে অংশ নেন। অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, কণ্ঠে ছিল প্রার্থনা—যেন পরিবারের একজন আপনজনকে শেষ বিদায় জানাচ্ছেন তারা।
বগুড়ার পুত্রবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক
দিনাজপুরের মেয়ে খালেদা খানম ১৯৬০ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাঘবাড়ি গ্রামে পুত্রবধূ হিসেবে আসেন। তখন তার স্বামী জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। সামরিক জীবনের নানা ব্যস্ততা, মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময় এবং স্বাধীনতার পরবর্তী অনিশ্চিত দিনগুলো—সবকিছুর মধ্যেও তিনি ছিলেন একজন নীরব গৃহিণী। সন্তান লালন-পালন ও সংসারের দায়িত্ব পালনেই কেটেছে তার জীবনের দীর্ঘ সময়। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয় গভীর সংকট। সেই সংকটময় সময়ে ইতিহাসের এক কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন খালেদা জিয়া। নেতৃত্বে আসেন বিএনপির, সংগঠিত করেন দলকে এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আশির দশকেই জাতীয় রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
বগুড়া ও খালেদা জিয়া: এক আবেগের নাম
১৯৯১ সালে বগুড়া থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বেগম খালেদা জিয়া। এরপর আরও দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বগুড়ার বিভিন্ন আসন থেকে যতবার তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, প্রতিবারই বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। বগুড়ার মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন নেত্রী নন—তিনি ছিলেন ঘরের মানুষ। স্থানীয়দের মুখে মুখে তার আদরের নাম ছিল ‘ব্যাটার বউ’। রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেও বগুড়ার মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতি আজও মানুষের হৃদয়ে জ্বলজ্বল করে। বগুড়ার মানুষ তাকে নিজেদের গর্ব হিসেবেই বিবেচনা করতেন।
কান্নায় ভেঙে পড়েন নেতাকর্মীরা
মঙ্গলবার সকালে বগুড়া জেলা বিএনপির কার্যালয়সহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মীদের কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। নওয়াববাড়ি রোডস্থ জেলা বিএনপি কার্যালয়ে সকাল থেকেই নেতাকর্মীদের ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ নির্বাক হয়ে বসে আছেন, কেউ চোখের জল মুছছেন—শোক যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র রেজাউল করিম বাদশা এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন।
ববগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কেবল আমাদের নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের মায়ের মতো। বগুড়ার মানুষের সঙ্গে তার আত্মার সম্পর্ক। তার মৃত্যুতে আমরা সত্যিকার অর্থেই এতিম হয়ে গেলাম। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তার আপসহীন নেতৃত্ব ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’
ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ম্যাডাম অসুস্থ অবস্থাতেও দলের ও দেশের মানুষের খোঁজখবর নিতেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য আমরা বারবার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু সুচিকিৎসার সুযোগ না দিয়েই তাকে চলে যেতে হলো। এই অপূরণীয় ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।’
দোয়া ও স্মরণে বগুড়া
বগুড় জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মরহুমার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনায় মঙ্গলবার শহরের বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। এতে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। একজন গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক—খালেদা জিয়ার জীবন ছিল সংগ্রাম, দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের অনন্য উদাহরণ। বগুড়ার মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন একজন আপন মানুষ হিসেবেই। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নয়—এ শূন্যতা একটি জনপদের, একটি ইতিহাসের।



