ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

চায়ের দামে আলু

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬, ০৫:২২ পিএম
আলু তোলা হচ্ছে। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

বগুড়ার শেরপুরের মাঠে শুরু হয়েছে আলু তোলার ব্যস্ততা। মাটির ভেতর থেকে উঠে আসছে লাল-সাদা গোল আলু। ঝুড়ি ভরে, বস্তা ভরে জমির এক পাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রাচুর্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে দীর্ঘশ্বাস। খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই দেখছেন সম্ভাব্য অর্ধেক লোকসানের আশঙ্কা।

জমিতেই আলু বিক্রি হচ্ছে ৬ থেকে ৯ টাকা কেজি দরে। কৃষকের কথায়, এক কাপ চায়ের দামে এখন এক কেজি আলু। হিসাব কষে অনেকেই দেখছেন, এ দরে বিক্রি করলে অর্ধেক পর্যন্ত লোকসান গুনতে হতে পারে।

সম্প্রতি উপজেলার শাহ বন্দেগী ও কুসুম্বি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, ফলন ভালো হলেও বাজার-দর নিয়ে হতাশা চাষিদের মুখে স্পষ্ট।

চাষিরা জানান, এ বছর কোম্পানির বীজ কিনতে হয়েছে ১৮০০ থেকে ১৯০০ টাকা বস্তায়। কৃষক উৎপাদিত বীজের দাম ছিল ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা। সারের বাজার-দর ১৮০০ থেকে ১৯০০ টাকা, যদিও সরকারি দাম ১৩৫০ টাকা। কিন্তু সরকারি সার মিলেছে মাত্র ১-২ বস্তা, সেটিও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে। ফলে অধিকাংশ কৃষককে বাড়তি দামে সার কিনতে হয়েছে।

এক বিঘা জমিতে কীটনাশকে খরচ হয়েছে ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা। সাতবার সেচে প্রায় ২০০০ টাকা। আলু তুলতে বিঘাপ্রতি শ্রমিক ব্যয় প্রায় ৫০০০ টাকা। দিনে ৩০০ টাকা মজুরিতে ৮-১০ জন শ্রমিক লাগে। সব মিলিয়ে এক বিঘায় মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। জমির লিজ বাবদ আরও ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে আলাদা করে। ফলন হয়েছে গড়ে ১২০ মণ প্রতি বিঘায়। কিন্তু বর্তমান দরে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই ওঠে না। কৃষকদের মতে, অন্তত ১৮ থেকে ২০ টাকা কেজি হলে কিছুটা স্বস্তি মিলত।

কুসুম্বি ইউনিয়নের টুনিপাড়া গ্রামের কৃষক টুলু বলেন, ‘দাম যাই হোক, আলু বিক্রি করতেই হবে। আলু তুলেই ধান লাগাতে হবে।’ কৃষক আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘গতবার লস, এবারও লস। ৮-১০ হাজার টাকা লাভ না হলে চাষ করে পোষাবে না।’

আরেক কৃষক আব্দুস সামাদ বলেন, ‘আজ দাম ৬-৭ টাকা। এক কাপ চায়ের দাম। এত কষ্ট করে চাষ করে লাভ কী?’ কৃষক আহম্মেদ আলী বলেন, ‘আমরা সঠিক মূল্য চাই। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।’

আরিফুল ইসলাম ৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘এ দরে বিক্রি করলে অর্ধেক লোকসান। ছোট কৃষকেরাই বেশি বিপদে পড়ে। সংরক্ষণের সুযোগ কম, সিন্ডিকেট তো আছেই।’

আলু ৯০ দিন বয়সেই পরিপক্ক হয় এবং হিমাগারে রাখার উপযোগী হয়। তবে সংরক্ষণ ব্যয়ও কম নয়। হিমাগারে রাখতে প্রতি বস্তা প্রায় ৩০০ টাকা লাগে। জমি থেকে সড়কে আনতে বস্তাপ্রতি ২৫-৩০ টাকা পরিবহন খরচ হয়। শেরপুর হাসপাতাল রোডের একটি কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা ৭ হাজার মেট্রিক টন। এখন পর্যন্ত সংরক্ষণ হয়েছে ৪০ হাজার বস্তা বা প্রায় ২৬০০ মেট্রিক টন। সব খরচসহ প্রতিবস্তা রাখা হচ্ছে ২২০ টাকায়, যা গত বছর ছিল ১৮০ টাকা।

ভবানিপুর ইউনিয়নের ওয়েস্টার্ন কোল্ড স্টোরেজের ধারণক্ষমতা ১২ হাজার মেট্রিক টন। সেখানে এখনো বুকিং চলছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দুই হিমাগারেই প্রায় ৭০ শতাংশ আলু রাখেন চাষিরা এবং ৩০ শতাংশ ব্যবসায়ী। দেশে প্রায় ৫০০টি কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ২৫০০ হ্যাক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৭৮০ হ্যাক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জুলফিকার হায়দার জানান, এ বছর বাম্পার ফলন হয়েছে। পার্টনার প্রোগ্রামের আওতায় ১০০ জন কৃষককে উত্তম কৃষি চর্চার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৬ জনের উৎপাদিত আলুর তালিকা বিদেশে রপ্তানির জন্য পাঠানো হয়েছে। উদ্যোগ সফল হলে কৃষক লাভবান হবেন। পাঁচটি কোল্ড স্টোরেজে মোট ৩৩ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অনেক কৃষক স্থানীয় পদ্ধতিতেও আলু সংরক্ষণ করছেন।

বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশ শেরপুরের আলুচাষিরা। তাদের দাবি, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে কৃষক টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।