ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সামনে ঈদ, বেচাকেনা জমে উঠেছে দুপচাঁচিয়ার কামারপল্লীতে

দুপচাঁচিয়া (বগুড়া) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ০২:৪২ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ব্যস্ত হয়ে উঠছে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার কামারপল্লীগুলো। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আগুনের তাপ, হাতুড়ির শব্দ আর লোহা পেটানোর আওয়াজে মুখর হয়ে উঠেছে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কামারশালা। কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার প্রয়োজনীয় দা, ছুরি, চাপাতি, বঁটি ও হাঁসুয়া তৈরিতে এখন দম ফেলার ফুরসত নেই কামার শিল্পীদের।

সরেজমিনে বুধবার (২০ মে) দুপচাঁচিয়া পৌর এলাকার কর্মকারপাড়া মহল্লা ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি কামারশালায় চলছে ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। কোথাও পুরোনো দা-ছুরিতে শান দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার তৈরি হচ্ছে নতুন চাপাতি। কয়লার চুলার দগদগে আগুনে লোহা গরম করে দক্ষ হাতে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের কোরবানির সরঞ্জাম। কেউ হাঁপর টানছেন, কেউ আগুনে লোহা পুড়িয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ নিখুঁতভাবে ধার দিচ্ছেন পুরোনো অস্ত্রপাতিতে।

কামার শিল্পীরা জানান, সারা বছর কাজের চাপ তুলনামূলক কম থাকলেও কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে তাদের কর্মব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। নতুন সরঞ্জাম তৈরির পাশাপাশি পুরোনো দা-ছুরিতে শান দিতে ক্রেতাদের ভিড়ও বাড়ছে প্রতিদিন।

পৌর এলাকার কামার শিল্পী মানিক কর্মকার ও ধীরেন চন্দ্র কর্মকার জানান, একটি ভালো মানের ছুরি তৈরি করতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। প্রথমে লোহা আগুনে গরম করে পানিতে ঠান্ডা করা হয়। এরপর হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে কাঙ্ক্ষিত আকার দেওয়া হয়। পরে ঘষামাজা ও বিশেষ প্রক্রিয়ায় ধারালো করে প্রস্তুত করা হয় দা কিংবা ছুরি।

তারা বলেন, বছরের এই সময়টাই আমাদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। সারা বছর তেমন কাজ থাকে না। কোরবানির ঈদ এলেই একটু বেশি আয় হয়। তখন পরিবার নিয়ে কিছুটা স্বস্তিতে চলতে পারি।

এদিকে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন সরঞ্জামের দামও বেড়েছে। ফলে অনেকেই নতুন দা বা ছুরি না কিনে পুরোনো সরঞ্জাম মেরামত করাতে আগ্রহী হচ্ছেন।

নতুন দা কিনতে আসা জাকিরুল হক বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার সবকিছুর দাম অনেক বেশি। তাই নতুন দা না কিনে পুরোনো দাটাই মেরামত করিয়েছি। সংসারের বাড়তি খরচ সামলাতে নতুন সরঞ্জাম কেনা এখন কঠিন।

দুপচাঁচিয়া পুরাতন বাজার শহরতলী রোডের কামার শিল্পী কালিপদ কর্মকার জানান, বর্তমানে বিভিন্ন ওজনের চাপাতি প্রতি কেজি ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মাংস কাটার চাকু প্রকারভেদে ৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা, ছোট, বড় ও মাঝারি ধরনের হাঁসুয়া ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকা, পাকা লোহার বঁটি ৬০০ টাকা এবং কাঁচা লোহার বঁটি ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

ঈদকে ঘিরে কামারপল্লীর এই কর্মচাঞ্চল্য শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের গল্প নয়, বরং গ্রামীণ ঐতিহ্য, শ্রম আর জীবনসংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আগুন, ঘাম আর হাতুড়ির শব্দে তৈরি হচ্ছে কোরবানির প্রস্তুতি, আর সেই শ্রমেই প্রাণ ফিরে পাচ্ছে ঈদের আমেজ।