বৈরি আবহাওয়া আর অতিবৃষ্টির আঘাতে জীবনের বড় স্বপ্নটিই যেন চোখের সামনে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা মমিনুল ইসলাম মিন্টুর।
বহু পরিকল্পনা, শ্রম ও সঞ্চিত পুঁজি ব্যয় করে তিনি বৃহৎ পরিসরে কমলার বাগান গড়ে তুলেছিলেন। চার বছর ধরে যত্ন করা সেই বাগান এবার প্রথম বাণিজ্যিক ফলনের মুখ দেখতে যাচ্ছিল।
কিন্তু হঠাৎ অতিবৃষ্টিতে একে একে ঝরে পড়ে প্রায় চারশ গাছের সব কমলা। যেই কমলা এখন বিক্রি করার কথা ছিল, সেই কমলাগুলোকে এখন বাগানের পাশে বড় বড় গর্তে ফেলে দিতে হয়েছে।
জানা যায়, উদ্যোক্তা মমিনুল প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় করে কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে ভারতের সীমান্তঘেষা একটি পাহাড়ি এলাকায় চার একর ২০ শতক জমি বর্গা নেন। সেখানে তিনি দার্জিলিং ও ম্যান্ডারিন জাতের চারশ চারা নিয়ে শুরু করেন কমলার বাণিজ্যিক চাষ।
পাশাপাশি মাল্টা, পেয়ারাসহ কয়েক ধরনের ফলের মিশ্র চাষও করেন তিনি। শুরুর তিন বছরে গাছ পরিচর্যা, সার, সেচ, শ্রমিক ও পাহারা সব মিলিয়ে তিনি জীবনযুদ্ধে ঝুঁকি নিয়েই এগিয়ে যান।
চলতি মৌসুমে তার বাগানে প্রথমবারের মতো আশানুরুপ ফলন দেখা দেয়। গাছ ভরে ওঠে সবুজ কমলায়।
স্থানীয়রা জানান, মৌসুমের শুরুতেই বাগানটি যেন উৎসবে রঙ ছড়াচ্ছিল। প্রতিদিনই আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ ভিড় করতেন বাগানে কমলা দেখতে।
মমিনুলও আশা করেছিলেন, এবার অন্তত ১০ লাখ টাকার কমলা বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু সেই আশার পুরো বিপরীত চিত্র তৈরি হয় আগস্টের শেষ দিকের বৈরি আবহাওয়ায়।
অতিবৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার কারণে প্রথমে কিছু গাছের ফল ঝড়ে পড়তে থাকে, এরপর একে একে প্রায় সব গাছই ফসল হারায়। এখন মাত্র ৭-৮টি গাছে কিছু কমলা টিকে আছে, যা দিয়ে কোনোভাবেই ক্ষতির সামান্য অংশও পোষানো সম্ভব নয়।
নিজের ক্ষতির কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন উদ্যোক্তা মমিনুল ইসলাম মিন্টু। তিনি বলেন, "কয়েক বছর ধরে গাছগুলোকে সন্তান স্নেহে লালন করেছি। এই বাগানের জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করেছি। ভাবছিলাম এবার কিছুটা হলেও লাভ হবে।
কিন্তু ঝড় সব শেষ করে দিল। এখন কীভাবে আবার শুরু করব বুঝতে পারছি না। সকলের পরামর্শ চেয়েছি, কিন্তু কোনো পরামর্শই কাজে আসেনি।
কৃষি অফিস ফোনেই সব দায় দায়িত্ব সেরে নিয়েছে। সরাসরি বাগানে এসে পরিদর্শন ও পরামর্শ দেওয়ার মনোভাব তাদের নেই। ক্ষতি হলে আমার হয়েছে, তাদের কি?"
বাগান ঘুরে দেখা যায়, গাছগুলো এখনও সবল, কিন্তু ফলহীন। লোকজন বাগানে এসে হতাশ গলায় ফিরে যান।
স্থানীয় বাসিন্দা জনি মোল্লা জানান, "আমাদের ইউনিয়নে মিন্টু ভাই কমলা চাষ করেছেন তা দেখতে ও কিনতে এসেছিলাম। তবে এসে দেখলাম গাছে কমলা নেই। তাই হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছি। মিন্টু ভাই যেহেতু উদ্যোক্তা, তাই সরকারের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।"
দৌলতপুর গ্রামের জালাল মিয়া জানান, "মমিনুল ইসলাম মিন্টু ভাইয়ের বাগানে প্রথমে ভালো ফল ছিল, আমরা প্রায়ই এই বাগানে ঘুরতে আসি। তবে এখন এসে দেখলাম সব কমলা ঝড়ে গেছে, গাছগুলো খালি। সরকারের উচিত মিন্টু ভাইয়ের পাশে দাঁড়ানো।"
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আয়শা আক্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, "এটি পুরোপুরি আবহাওয়াজনিত ক্ষতি। অতিবৃষ্টির কারণে ফলঝরা দেখা গেছে।
তবে মমিনুলের বাগানে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। আগামি মৌসুমে যাতে তিনি ভালো ফলন পান, সে জন্য কৃষি বিভাগ তার সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দেবে। কৃষি অফিস তার পাশে আছে।"


