পটিয়া উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে পুলিশের তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। রহস্যজনকভাবে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এতে চুরি-ডাকাতি, অপহরণ, জায়গা-জমি দখল ও ছিনতাইয়ের পাশাপাশি বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসী তৎপরতা। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদক ব্যবসা, জমি দখল-বেদখলের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।
পটিয়া উপজেলায় গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে জায়গা-জমির বিরোধ, ঝগড়া-বিবাদ, মাদকদ্রব্য বিক্রয়ে বাধা, ছিনতাই ও অপহরণকে কেন্দ্র করে ১৮টি নৃশংস খুনের মতো ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। সমস্ত খুনের ঘটনার পর অপরাধে জড়িত আসামিরা এলাকায় প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার না করে নীরব ভূমিকা পালন করছে। ভুক্তভোগী জনসাধারণের দাবি, পটিয়া থানার পরিবেশ একেবারেই নোংরা করে ফেলছেন কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা। অভিযোগ আছে, যে যত বেশি ঘুষ দিচ্ছে, বিচার সেদিকেই মোড় নিচ্ছে। হত্যা মামলার বাদীদের বিরুদ্ধে উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। পুলিশ আসামিকে গ্রেপ্তার না করে আইনজীবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
নিরীহ জনসাধারণের দাবি, পটিয়া থানায় এরকম বিচারহীনতার পরিবেশ বিগত ৫০ বছরে তারা কখনও দেখেননি। মামলার বিচারপ্রার্থী নিরীহ ও গরিব মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। যার ফলে প্রতিনিয়ত মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং হয়রানির শিকার হচ্ছে।
গত ১৭ নভেম্বর হাইদগাঁও কাজীপাড়া এলাকায় ভাতিজার হাতে রাশেদ নামে এক চাচা খুন হন। ৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং হাইদগাঁও ফইজ্জারপুল এলাকায় রাজীব দাশের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। পটিয়া পৌরসদরের গিরিচৌধুরী বাজার এলাকায় সন্ত্রাসীরা আব্দুল আজিজ নামে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। গত ১০ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং হাবিলাসদ্বীপে নির্মাণাধীন সুইচ গেটের দারোয়ান বদিউল আলমকে হত্যা করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পটিয়া জঙ্গলখাইন গ্রামে গৃহবধূ শিউলী বেগমকে (৩৫) কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নির্মমভাবে হত্যা করে। ৩০ ডিসেম্বর পটিয়া হাইদগাঁও মাহাদাবাদ ভাঙারপুল এলাকায় জায়গা-জমির বিরোধের জেরে কৃষক শামসুল আলমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৮ এপ্রিল ২০২৫ ইং রাতে খুন হন পটিয়া ছনহরা গ্রামের নূরুল ইসলাম (৫২)। রাতে কে বা কারা তাকে হত্যা করে ক্ষেতের জমিতে ফেলে যায়। গত ৩০ মে ২০২৫ পটিয়া পৌরসভার মাঝেরঘাটার নূরুল হককে জায়গা-জমির বিরোধের জেরে প্রতিবেশীরা নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। উক্ত ঘটনায় পুলিশ একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি। উল্টো বাদীর পুরো পরিবারকে হয়রানির উদ্দেশ্যে মামলা দিয়ে ঘরছাড়া করা হয়।
গত ১৭ জুন চট্টগ্রামের পটিয়ায় মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন (৩৫) নামের এক মাইক্রোবাসচালককে হত্যা করে সেতুর নিচে লাশ ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। নিহত জসিম পটিয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং মরহুম মোহাম্মদ ইলিয়াসের পুত্র। গত ১৮ জুন ২০২৫ বুধবার বিকেলে পটিয়া ইন্দ্রপুল সেতুর নিচ থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শুক্রবার পটিয়ার ডেঙ্গাপাড়ায় ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোহাম্মদ মামুন (২৪) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ডেঙ্গাপাড়া স্বপ্ন ঈদগাহ মসজিদ এলাকায় এ ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে। নিহত মামুন ওমানপ্রবাসী ছিলেন।
গত ২৯ মার্চ ২০২৬ পটিয়ার চাটারায় জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে গুরুতর আহত মাহাবুব আলম (৩৫) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঘটনার তিন দিন পর চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে মারা যান। নিহত মাহাবুব আলম পটিয়া উপজেলার ছনহরা ইউনিয়নের মধ্যম চাটারা গ্রামের হাজী এজাহার মিয়ার ছেলে। পুলিশ জানায়, ২৬ মার্চ সকাল ১১টার দিকে মধ্যম চাটারা গ্রামের আবু ছৈয়দ সওদাগরের দোকানের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
গত ২০ এপ্রিল ২০২৬ জায়গা-জমির বিরোধের জেরে দক্ষিণ গোবিন্দারখীল ডাক্তারবাড়ি নিবাসী পটিয়া স্টেশন রোডের ব্যবসায়ী জনাব আবুল কাশেম সওদাগর প্রতিবেশীর নির্মম হামলার শিকার হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে মৃত্যুবরণ করেন।
গত ৯ জুন ২০২৬ তারিখ পটিয়া কচুয়াই ইউনিয়নের চক্রশালায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে পঙ্কজ শীল (২৬) নামে এক যুবক নিহত হন। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিলক চক্রবর্তী (৩০) নামে আরও এক যুবক। পঙ্কজ শীল একই এলাকার মিলন শীলের ছেলে। উক্ত ঘটনায় উত্তেজিত জনতা এক ছিনতাইকারীকে ধরে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। ঘটনার এক সপ্তাহ পর পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে আরও দুইজনকে গ্রেপ্তার করে।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় অপহরণের এক দিন পর শিশু জায়ানের বস্তাবন্দি মরদেহ প্রতিবেশীর বাড়ির পাশের ময়লার ভাগাড় থেকে উদ্ধার করা হয়।
গত ১৮ জুন ২০২৬ বৃহস্পতিবার রাতে পটিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল গ্রামের পূর্বপাড়া এলাকার একটি ময়লার ভাগাড় থেকে ডিবি পুলিশ ও থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে লাশটি উদ্ধার করে। পূর্বের মতবিরোধ এবং প্রতিবেশী একটি পরিবারকে ফাঁসাতে খুনি ও অপহরণকারী সাদিয়া সুলতানা নিহা নিহত শিশু জায়ানের মাথায় হাতুড়ির আঘাত করে তাকে হত্যা করে। উক্ত ঘটনায় জড়িত নিহতের ফুফু সাদিয়া সুলতানা নিহা, তার পিতা সাইফুদ্দিন এবং তার মা শাহনুর আক্তারকে ঘটনাস্থল থেকে তাদের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত দুই বছরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর অধিকাংশ আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। অনেক অজ্ঞাতনামা ঘটনারও কোনো ক্লু উদ্ধার হয়নি। সাধারণ মানুষ ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছে। পটিয়ায় খুন ও অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে পুলিশের গা-ছাড়া মনোভাব ও কর্তব্যে অবহেলাকে দায়ী করছেন কেউ কেউ। আসামিরা অর্থ, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে মামলাগুলোকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই ও জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বেড়েছে। অপরাধ দমনে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে পটিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব খোরশেদ আলম বলেন, সম্প্রতি যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার অনেকগুলোই পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে সংঘটিত হয়েছে। তবে অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং অপরাধ দমনে পুলিশ নিয়মিত কাজ করছে। পংকজ শীল ও শিশু জায়ান হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যান্য ঘটনাগুলোর তদন্তও চলমান রয়েছে।



