ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, জনজীবনে আতঙ্ক

যশোর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ৭, ২০২৬, ১১:৫৩ এএম
বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন ও ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগী। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

যশোরে দুদিনের ব্যবধানে দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জনজীবনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে পেছন দিক লক্ষ্য করে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় যশোর পৌরসভার বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে। দুদিন পর একইভাবে ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীও নৃশংসভাবে খুন হন।

হত্যাকাণ্ডের পেছনে পেশাদার শুটারদের সম্পৃক্ততা ধরা পড়েছে। নিহত রানা প্রতাপের বান্ধবী ঝুমুর মণ্ডলকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে হত্যার মূল মোটিভ এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি। পুলিশ খুনিদের ধরতে তৎপর।

৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় যশোর শহরের শংকরপুর ইসহাক সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আলমগীর হোসেনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। তিনি যশোর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি ভূমি ব্যবসায়ী ও দানবীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয়রা জানান, তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ নেই।

সচেতন মহলের মন্তব্য, শহরের ব্যস্ত সড়কে সন্ধ্যায় মোটরসাইকেল ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করা হয়েছে। এটি নিছক ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক শক্তিকে সতর্ক করার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আলমগীর হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মনিরামপুরের কপালিয়া বাজারে রানা প্রতাপ বৈরাগীকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে সাতটি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। রানা প্রতাপ কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামের তুষার কান্তি বৈরাগীর ছেলে।

নিহত রানা প্রতাপের স্ত্রী সীমা বৈরাগী জানান, তার স্বামীর বান্ধবী ঝুমুর মণ্ডলের ‘ঝুম বিউটি পার্লার’ রয়েছে। রানার সঙ্গে ঝুমুরের ঘনিষ্ঠতা জানাজানি হলে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সীমার ধারণা, এই হত্যা ঘটাতে ঝুমুরের হাত থাকতে পারে।

একই দিনে ঝিনাইদহের মহেশপুরে বিএনপি সমর্থক মতিয়ার রহমান মণ্ডলও মোটরসাইকেল থেকে পেছন দিক লক্ষ্য করে গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর অবস্থায় তাকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

নিহত রানা প্রতাপের অতীত নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকায় প্রতিপক্ষের প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও হত্যার কায়দা ও সময়সূচিতে মিল থাকায় এটি কাকতালীয় ঘটনা নয়—এমন প্রশ্নও উঠছে।

মনিরামপুর থানার ওসি রজিউল্লাহ খান জানান, রানা প্রতাপ বৈরাগী হত্যার ঘটনার তদন্তে তিনটি দিক সামনে রাখা হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি দলের প্রতিশোধ, পেশাগত দ্বন্দ্ব এবং ব্যবসায়িক শত্রুতা। হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ঝুমুর মণ্ডলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

বিএনপির খুলনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, অতীতে যশোরে বিএনপির অন্তত ৬৮ নেতাকর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। একই কায়দায় হত্যাকাণ্ড চললে প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রীয় কাঠামো কি বদলেছে, নাকি শুধুই ক্ষমতার মুখ বদলেছে।

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আবুল বাশার জানান, রানা প্রতাপ বৈরাগী একজন চরমপন্থি ও অপরাধী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ছিল।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, আলমগীর হোসেনের হত্যায় পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণ জড়িত। হত্যার মিশনে অংশ নেওয়া শুটারদের ধরতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে যশোরে মোট ৬০টি হত্যাকাণ্ড, পাঁচটি ডাকাতি, ২১টি দস্যুতা, ৮৭টি ধর্ষণ এবং ১৭টি বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছে। অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ৩২টি। যশোরের ৯টি থানায় মোট ২,৮৪৩টি মামলা দায়ের হয়েছে।