ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

জমি বিক্রির টাকায় চলতেন খুনি পলাশ, রফিকুলের তিন সন্তান পিতৃহারা

বিল্লাল হোসেন, যশোর
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ১০:৪২ পিএম
যুবদলের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলামে ও খুনি আব্দুল আলিম পলাশ। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড (জগহাটি) যুবদলের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলামে (৪৫) খুনি আব্দুল আলিম পলাশ (৩৪) একজন মাদকাসক্ত ছিলেন। পিতার রেখে যাওয়া জমি বিক্রি করে চলতেন তিনি। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্ত্রী জোবাইদা খাতুন তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। এদিকে, রফিকুল ইসলামের পরিবারে শোকের মাতম চলছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস। অকালে পিতৃহারা হয়েছে তার তিন সন্তান।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) আছরের পর জানাজার নামাজ শেষে রফিকুল ও পলাশের মরদেহ নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গণপিটুনিতে পলাশ নিহতের ঘটনায় অজ্ঞাত কয়েক শ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তার বোন পাপিয়া।

জগহাটি গ্রামের লোকজন জানান, গ্রামের পশ্চিমপাড়ার মৃত হযরত মণ্ডলের ছেলে পলাশের সলুয়া বাজারে একটি ব্যাগের দোকান আছে। নামমাত্র ওই দোকানটি প্রায় সময়ই বন্ধ থাকত। বাবার রেখে যাওয়া জমি বিক্রি করে চলতেন তিনি। মাদকের পেছনে ছুটে লাখ লাখ টাকা নষ্ট করেছেন। তার অত্যাচারে পরিবারের সদস্যরা অতিষ্ঠ ছিলেন।

কয়েক মাস আগে পলাশ স্ত্রী জোবাইদা খাতুনকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার হাতের পাঁচটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পলাশকে ছেড়ে পিতার বাড়ি কমলাপুরে চলে যান জোবাইদা। তারা আরও জানান, পলাশকে নিয়ে পরিবারে শান্তি ছিল না। টাকার জন্য বৃদ্ধা মাকে মারধর করতেন। তাকে নিয়ে রীতিমতো মানসিক দুশ্চিন্তায় ছিলেন পিতা হযরত মণ্ডল। চার বছর আগে তিনি স্ট্রোক করে মারা যান। এ ছাড়া পলাশ বিগত দিনে চাচাতো ভাই করিম মোল্যাকেও কুপিয়ে জখম করেছে।

পলাশের বাড়িতে দেখা গেছে, একমাত্র ছেলে পলাশকে হারিয়ে শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন বৃদ্ধা মা পরিছন বেগম। কথা বলার সময় নিজের নামটাও বলতে পারছিলেন না তিনি। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, তার পলাশকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। পাশে বসে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন একমাত্র বোন পাপিয়া। প্রতিবেশী কয়েকজন নারী বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

স্থানীয়রা জানান, জগহাটি গ্রামের পূর্বপাড়ার রফিকুল ইসলাম একজন ভালো মনের মানুষ ছিলেন। সলুয়া বাজারে মুদি দোকানের ব্যবসা করতেন। কোনো অপরাধ না করেও নেশাগ্রস্তের হাতে নির্মমভাবে খুনের শিকার হয়েছেন রফিকুল। তার এমন মৃত্যু সত্যিই দুঃখজনক। দাম্পত্য জীবনে রফিকুল তিন সন্তানের জনক। তারা হলো সুমাইয়া (২০), সুরাইয়া (১০) ও আবু হানিফা (৭)। নিহত রফিকুলের বাড়িতে শোকের মাতম চলতে দেখা গেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার বাতাস। বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও সন্তানদের কান্নায় বুকফাটা আর্তনাদ দেখে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কোনো সান্ত্বনায় তাদের চোখের পানি থামছে না।

রফিকুলের মা মনোয়ারা বেগম জানান, ‘তার সোনা ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। সারা দিন ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। পলাশ হেরোইন খেয়ে আমার সোনার জীবন কেড়ে নিয়েছে।’

স্ত্রী লিপি খাতুন জানান, ‘আমার স্বামীর কোনো দোষ নেই। ন্যায্য টাকা দিয়ে ৮ শতক জমি কিনেছে। তারপরও পলাশ তার মানুষটাকে নৃশংসভাবে খুন করেছে। আমার তিন ছেলে-মেয়েকে অকালে পিতৃহারা করা হলো।’ কাঁদতে কাঁদতে পিতার খুনের বিচার দাবি করছিল শিশু সুরাইয়া।

রফিকুলের চাচাতো ভাই শফিয়ার রহমান জানান, জগহাটি গ্রামের আহাদ আলীর ছেলে মিষ্টি ব্যবসায়ী আশাদুল ইসলাম ভুল বুঝিয়ে পলাশকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। ফলে নেশাগ্রস্ত পলাশ প্রকাশ্যে রফিকুলকে খুন করে। তিনি আশাদুলের বিচার দাবি করেছেন।

চৌগাছা থানার ওসি রেজাউল করিম জানান, রফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পলাশের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। রফিকুল ইসলামের চাচাতো ভাই শফিয়ার রহমান মামলাটি করেছেন।

এদিকে, গণপিটুনিতে পলাশ নিহতের ঘটনায় তার বোন পাপিয়া অজ্ঞাতনামা ২০০/২৫০ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেছেন। মামলাটি তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উল্লেখ্য, জগহাটি গ্রামের তবজেল মল্লিকের ছেলে রফিকুল ইসলাম দুই বছর আগে একই গ্রামের হযরত মণ্ডলের ছেলে আব্দুল আলিম পলাশের কাছ থেকে ৮ শতক জমি ক্রয় করেন। কিছুদিন আগে পলাশ ওই জমি জগহাটির আহাদ আলীর ছেলে মিষ্টি ব্যবসায়ী আশাদুল ইসলামের কাছে বিক্রি করে দেন। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। এরই জের ধরে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) চৌগাছা উপজেলার সলুয়া বাজারে যুবদল নেতা রফিকুল ইসলামকে (৪৫) প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় খুনি আব্দুল আলিম পলাশ গণপিটুনিতে নিহত হন।