যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ঝাউদিয়া গ্রামের রফি বিশ্বাসের ছেলে আব্দুল লতিফ (৪৫)। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তিনি যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরে অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসকরা সরকারি ব্যবস্থাপনায় তার মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।
২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি সফলভাবে তার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়। অথচ বেসরকারি হাসপাতালে এ ধরনের অস্ত্রোপচারে দুই লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়। আব্দুল লতিফের মতো মোট ৪৫ জন রোগীর মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার বিনা মূল্যে সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন চিকিৎসকরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ স্পাইন সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. শাহআলম যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে একটি সেমিনারে আসেন। ওই দিন তার নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল দুজন রোগীর মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার করে কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
সেই থেকে হাসপাতালে নিয়মিতভাবে বিনা মূল্যে মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে। এতে গরিব ও অসহায় রোগীরা আর্থিক ও শারীরিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন।
ভুক্তভোগী রোগী আব্দুল লতিফ জানান, বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সামর্থ্য তার ছিল না। ফলে দীর্ঘদিন তিনি শারীরিক কষ্টে ভুগছিলেন। জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের আন্তরিকতায় সরকারি ব্যবস্থায় অস্ত্রোপচার করিয়ে তিনি এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন।
মনিরামপুর উপজেলার ছালামতপুর গ্রামের মৃত ইসলাম বাকীর ছেলে কেসমত আলী (৫৫) জানান, একটি দুর্ঘটনায় তার মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় ছিলেন। পরে যশোর জেনারেল হাসপাতালে বিনা মূল্যে অস্ত্রোপচার করিয়ে তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
যশোর মেডিকেল কলেজের (যমেক) অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. জহিরুল ইসলাম জানান, যমেকে স্পাইন সার্জারির আলাদা বিভাগ না থাকলেও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৪৫ জন রোগীর মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যাদের অধিকাংশই দরিদ্র।
তিনি আরও জানান, মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার সাধারণত দুই ধরনের—পিএলআইডি ও স্ক্রু ফিক্সেশন। পিএলআইডি অস্ত্রোপচার বেসরকারি হাসপাতালে ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা এবং স্ক্রু ফিক্সেশনে দুই লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়। সরকারি হাসপাতালে পিএলআইডি অস্ত্রোপচার বিনা মূল্যে করা হচ্ছে। তবে স্ক্রুর খরচ রোগীর স্বজনদের বহন করতে হয়।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আহসান কবির বাপ্পি জানান, সরকারি ব্যবস্থাপনায় মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচার হাসপাতালের চিকিৎসাসেবাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছে। গরিব রোগীরা বিনা মূল্যে এই সেবা পাচ্ছেন। তবে অপারেশন থিয়েটারের জায়গা সংকটের কারণে নিয়মিতভাবে অস্ত্রোপচার পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৪৫ জন রোগীর স্পাইন সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে এবং যশোরবাসী বিনা মূল্যে উন্নত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন।


