ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬

মেসি কেন বারবার পেনাল্টি মিস করেন?

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০১:১৬ এএম
ছবি- সংগৃহীত

লিওনেল মেসিকে বর্ণনা করতে অসাধারণ, অনন্য বা সর্বকালের সেরার মতো বিশেষণ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু পেনাল্টি নেওয়ার ক্ষেত্রে এই আর্জেন্টাইন তারকার পরিসংখ্যান খুব একটা ব্যতিক্রমী নয়।

গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জয়ের ম্যাচে ১২ গজ দূর থেকে তার মিস করা শটটি ছিল বিশ্বকাপে নির্ধারিত সময়ে নেওয়া সাতটি পেনাল্টির মধ্যে তৃতীয়বার ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা। এরপর মিশরের বিপক্ষেও তিনি একটি পেনাল্টি মিস করেন। এর মাধ্যমে একই বিশ্বকাপে শুটআউটের বাইরে দুটি পেনাল্টি মিস করা প্রথম খেলোয়াড় হন মেসি।

চার বছর আগে পোল্যান্ডের গোলরক্ষক ভয়চেখ শেজনি তার একটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন। ২০১৮ সালে আইসল্যান্ডের গোলরক্ষক হানেস থর হ্যালডোরসনও তাকে গোল করতে দেননি।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের হিসাব করলে, মেসি ৩২টি পেনাল্টি থেকে গোল করেছেন ২৫টি। আর ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ১৫০টি পেনাল্টি থেকে তার গোল ১১৬টি—সাফল্যের হার প্রায় ৭৭ শতাংশ। শীর্ষ পর্যায়ের খেলোয়াড়দের তুলনায় এই হার কিছুটা কম।

পরিসংখ্যানটি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। কারণ মেসিকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার ঝুলিতে রয়েছে আটটি ব্যালন ডি’অর এবং চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা।

মেসি গোল করেন, সতীর্থদের দিয়ে গোল করান, মাঠে অসাধারণ জায়গা খুঁজে নেন এবং নিখুঁত পাস দেওয়ার ক্ষমতায় অনন্য। ভবিষ্যতে তার বাঁ পায়ের দক্ষতার সমকক্ষ কোনো খেলোয়াড় পাওয়া কঠিন বলেই মনে করেন অনেকে।

তাহলে সহজতম সুযোগ হিসেবে বিবেচিত পেনাল্টিতে কেন তার সাফল্য তুলনামূলক কম?

একটি প্রচলিত ধারণা হলো, বাঁ-পায়ের খেলোয়াড় হওয়ার কারণেই মেসি পেনাল্টিতে কিছুটা পিছিয়ে। তবে পরিসংখ্যান এই ধারণাকে সমর্থন করে না। বরং বাঁ-পায়ের খেলোয়াড়ের সংখ্যা কম হওয়ায় তারা কম পেনাল্টি নেন। একই সঙ্গে তাদের শটের দিক অনুমান করা গোলরক্ষকদের জন্য কঠিনও হতে পারে।

মেসির পেনাল্টি নেওয়ার অভিজ্ঞতা অবশ্য দীর্ঘদিনের। ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দুটি স্পট কিক থেকেই গোল করেছিলেন তিনি। প্রথমটি নিচের বাম কোণায় এবং দ্বিতীয়টি বিপরীত দিকে পাঠিয়ে গোলরক্ষককে ভুল পথে পাঠান।

আর্জেন্টিনার হয়ে পেনাল্টি শুটআউটে প্রথম শট নেওয়ার দায়িত্ব তিনি নিয়েছেন নয়বার। এর মধ্যে সাতবার সফল হয়েছেন। ব্যর্থতার দুটি ঘটনা আসে কোপা আমেরিকায়—২০১৬ সালে চিলির বিপক্ষে ফাইনালে এবং ২০২৪ সালে ইকুয়েডরের বিপক্ষে সেমিফাইনালে।

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মিস করা পেনাল্টিটি নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়। টেক্সাসের আর্লিংটনে গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগারের সঙ্গে মানসিক লড়াইয়ে হেরে যান মেসি।

ভিএআরের মাধ্যমে লাউতারো মার্টিনেজের ওপর স্টেফান পোশের ফাউল নিশ্চিত হওয়ার পর পেনাল্টি নেওয়ার আগে মেসি পাঁচ মিনিটেরও বেশি সময় অপেক্ষা করেন। ছোট রান-আপ নিয়ে এগিয়ে এসে শেষ দুই ধাপে গতি কমিয়ে গোলরক্ষককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন তিনি।

কিন্তু শ্লাগার শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। মেসির শট ডান পোস্টের বাইরে চলে যায়।

পরে মেসি বলেন, ‘আমি রেগে গিয়েছিলাম। আমি খুব বাজেভাবে শট নিয়েছিলাম।’

বিশ্লেষকদের মতে, মেসির পেনাল্টি নেওয়ার ধরনই কখনো কখনো তার দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি অনেক সময় গোলরক্ষকের গতিবিধি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে চান। এতে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ কমে যায় এবং শটের নির্ভুলতাও কিছুটা কমতে পারে।

এই কৌশলটি জর্গিনহো, রবার্ট লেভানডস্কি এবং হ্যারি কেইনের মতো খেলোয়াড়দের সঙ্গেও দেখা যায়।

গত বিশ্বকাপে অবশ্য মেসি সাতটি পেনাল্টির মধ্যে ছয়টিতে গোল করেছিলেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনাল ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালের শুটআউটেও সফল হন তিনি।

মেসি নিজেই বলেছিলেন, লরিসের বিপক্ষে কোথায় শট করব, সেটা নিয়ে ভাবছিলাম না। বিষয়টি ছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করা।

ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে অবশ্য তিনি ভিন্ন পদ্ধতি বেছে নেন। গোলরক্ষক ডমিনিক লিভাকোভিচকে অপেক্ষায় না রেখে শক্তিশালী শটে বল জালে পাঠান।

মেসির পেনাল্টি নেওয়ার ধরন কখনো স্থির নয়। তিনি নির্দিষ্ট একটি জায়গা বা একই ধরনের শটে নির্ভর করেন না। কখনো নিচু শট, কখনো শক্তিশালী আঘাত, আবার কখনো পানেঙ্কা—সব ধরনের কৌশলই ব্যবহার করেছেন তিনি।

২০১২ সালে ৯১ গোলের ঐতিহাসিক বছরে মেসি ১৭টি পেনাল্টির মধ্যে ১৪টিতে গোল করেছিলেন। এরপর তার শটের ধরনে পরিবর্তন আসে। রান-আপ ধীর হয়, শক্তিশালী শটের ব্যবহার বাড়ে এবং মাঝেমধ্যে পানেঙ্কা কৌশলও দেখা যায়।

তবে প্রতি মৌসুমেই একাধিক পেনাল্টি নেওয়ার পর অন্তত একটি মিস করেছেন তিনি। কোপা আমেরিকায় ইকুয়েডরের বিপক্ষে পানেঙ্কা শট বারে লাগে। আবার শার্লটের গোলরক্ষক ক্রিস্টিয়ান কাহলিনাও একই কৌশল ঠেকিয়ে দেন।

তবু মেসি মেসিই। তার অন্যান্য অসাধারণ পারফরম্যান্স অনেক সময় এই দুর্বলতাকে আড়াল করে দেয়। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও পেনাল্টি মিসের পর তিনি দুটি গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসে পুরুষদের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেন।

সর্বকালের সেরাদেরও কিছু দুর্বলতা থাকে। মেসির ক্ষেত্রে সেই দুর্বলতার নাম—পেনাল্টি।