ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

ভারতের নিষেধাজ্ঞায় বেনাপোল বন্দরে রপ্তানি ঘাটতি ১ লাখ ৯০ হাজার টন

বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ১০:০৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

সরকার পরিবর্তনের প্রায় দুই বছর পার হলেও বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ভারতের আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও শর্ত প্রত্যাহার হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যে। সর্বশেষ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় এ বন্দর দিয়ে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫৮ মেট্রিক টন। এতে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠান। বেকার হয়ে পড়েছেন তাদের কর্মচারীরা। ফলে বেনাপোল ও পেট্রাপোল বন্দর এলাকায় পরিবহন, গুদাম, হ্যান্ডলিং শ্রমিক এবং ব্যবসায় ব্যাপক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দুই দেশের বন্দর এলাকায়।

বেনাপোল বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ১৩ কর্মদিবসে ভারত থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে তিন হাজার ৩৮টি ভারতীয় ট্রাক প্রবেশ করলেও বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৭৫৩ ট্রাক পণ্য। আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ভারত থেকে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ ট্রাক পণ্য আমদানি এবং ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হতো। এখন আমদানি নেমে এসেছে ২০০ থেকে ৩০০ ট্রাকে। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানিও নেমে এসেছে দিনে ২০ থেকে ১০০ ট্রাকের নিচে।

বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য ভারতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭২ মেট্রিক টন। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে রপ্তানি হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৪০ মেট্রিক টন পণ্য। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি কমেছে ৭৫ হাজার ২৩২ মেট্রিক টন। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৮২ মেট্রিক টনে। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল পাট, পাটজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, কেমিক্যাল, বসুন্ধরা টিস্যু, মেলামাইন ও মাছ। কিন্তু দুই দেশের সরকারের বিধিনিষেধের কারণে আগের তুলনায় বর্তমানে তা শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, ভারত-বাংলাদেশের পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞায় দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দরে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি ও সংকট তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক মন্দা এবং গত ৫ আগস্টের পর একের পর এক দুই দেশের পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞায় দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ধস নামে। ভারত থেকে যেমন কমে আসছে আমদানিকৃত পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা, তেমনি ভারতে রপ্তানিকারী ট্রাকের সংখ্যাও কমে আসছে। এর ফলে গভীর সংকটে পড়েছেন বেনাপোলের কয়েকশ সিএন্ডএফ এজেন্ট মালিক, কর্মচারী এবং বেনাপোল স্থলবন্দরে কর্মরত এক হাজারের বেশি শ্রমিক। ভারত সরকারের আরোপিত শর্ত ও নিষেধাজ্ঞার কারণেই আমদানি-রপ্তানিতে এমন বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, স্থলপথে যেসব পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো আবার চালু করা হোক।

বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল থেকে ভারতের আকাশপথ ব্যবহার করে বাইরের দেশে বাংলাদেশি পণ্যের স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের দাবিতে দেশীয় শিল্প রক্ষার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ সরকার স্থলপথে ভারত থেকে সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। একই বছরের ১৭ মে ভারত সরকার আরেকটি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে গার্মেন্টস, তৈরি পোশাক, তুলা, সুতির বর্জ্য, প্লাস্টিক, কাঠের তৈরি আসবাবপত্র এবং ফলজাতীয় পণ্য স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ২৬ জুন পাট ও পাটজাত পণ্য স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ করে ভারত। সর্বশেষ ১১ আগস্ট নতুন করে বস্ত্র ও পাটজাত চার ধরনের পণ্য স্থলবন্দর ব্যবহার করে আমদানিতে না করেছে ভারত। এগুলো হলো, পাট কিংবা অন্য কোনো ধরনের উদ্ভিজ্জ তন্তু থেকে উৎপাদিত কাপড়, পাট দিয়ে তৈরি দড়ি, রশি, সুতলি, অন্য তন্তু দিয়ে তৈরি দড়ি, রশি, সুতলি এবং পাটের বস্তা ও ব্যাগ।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক জানান, বাংলাদেশে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও ভারত এসব নিষেধাজ্ঞা ও শর্ত প্রত্যাহার করেনি। ফলে বেনাপোল বন্দর দিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, ভারত বাধা হয়ে দাঁড়ালে বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে। দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভারতের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং একই সঙ্গে বিকল্প বাজার সম্প্রসারণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি।

বেনাপোল ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্টার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান ট্রানজিট সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো গেলে বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এছাড়া স্থলপথে যেসব পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেগুলো পুনরায় চালু করা উচিত।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন বলেন, এ বন্দর দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের সিংহভাগ বাণিজ্য সম্পন্ন হলেও ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর পণ্যবাহী ট্রাকের আসা-যাওয়া কমেছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাণিজ্য কমে গেছে। বাণিজ্যের পরিমাণ কমে আসায় বন্দর দিয়ে সরকারের রাজস্ব আয়েও প্রভাব পড়েছে। এতে শুধু বাংলাদেশের নয়, ভারতেরও ক্ষতি হচ্ছে। তিনি আরও জানান, দুই দেশের পক্ষ থেকে আরোপিত নানা বিধিনিষেধই বাণিজ্যে এ ধসের মূল কারণ। রপ্তানি বাণিজ্য বাড়াতে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।