আজ ১৬ জুলাই ২০২৬। ঠিক চার বছর আগের এক তপ্ত দুপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশালে রাস্তা পারাপারের সময় ট্রাকের চাকার চাপে অন্তসত্ত্বা নারীর পেঠ ফেটে অলৌকিকভাবে জন্ম নিয়েছিল শিশু ফাতেমা। ঘাতক ট্রাক চাপায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ফাতেমার অন্তঃসত্ত্বা মা রত্না বেগম ও বাবা জাহাঙ্গীর আলম। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় তার ছয় বছরের বড় বোন সানজিদাও। মায়ের পেট ফেটে পিচঢালা তপ্ত সড়কে ছিটকে পড়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া সেই সদ্যোজাত শিশুটি আজ ৪ বছর পূর্ণ করল।
বর্তমানে ফুটফুটে ফাতেমার নিরাপদ আশ্রয় ঢাকার আজিমপুর ছোটমণি নিবাস। চার বছর ধরে ফাতেমার বড় হচ্ছে, মুখে ফুটেছে বুলি। তবে সে বোঝে না ‘দুর্ঘটনা’ বা ‘মৃত্যু’ কী। ফাতেমার দাদা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল জানান, ফাতেমার স্মৃতিতে মা-বাবার কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই, তবে সে প্রায়ই তার বাবার খোঁজ করে অবুঝ গলায় প্রশ্ন করে, আমি এক্সিডেন্ট হইয়া বাচ্চা হইছি, আব্বা আম্মা কই? এত ছোট বয়সে মা-বাবার মৃত্যুর আঘাত সইতে পারবে না বিধায় পরিবার তাকে এখনো সত্যটি জানায়নি। ছোটমণি নিবাসের নিয়ম অনুযায়ী বয়স ছয় বছর পূর্ণ হলে ফাতেমাকে বাড়িতে নিয়ে নিজের কাছেই বড় করবেন বলে প্রহর গুনছেন তার দাদা।
ফাতেমার বাবা জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম দিনমজুর। তার আকস্মিক প্রয়াণে ফাতেমা ছাড়াও বাড়িতে রেখে গেছেন তার বৃদ্ধ বাবা-মা এবং আরও দুই সন্তান অষ্টম শ্রেণির জান্নাত (১৩) ও তৃতীয় শ্রেণির এবাদত (১০)। শারীরিক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ দাদুর একটি ছোট্ট দোকানের সামান্য আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
লন্ডন থেকে ফাতেমা ও তার পরিবারের আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার নির্দেশে সাবেক ছাত্রনেতা নাইমুল করিম লুইনের মাধ্যমে প্রতি মাসে ফাতেমার ত্রিশালের বাড়িতে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় উপহারসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পরিবারটির জন্য একটি পাকা বাড়ি নির্মাণ কাজও চলমান রয়েছে। এছাড়াও শিশু ফাতেমার অলৌকিক জন্মকে স্মরণীয় রাখতে তাদের বাড়ির সামনের সড়কটির নাম রাখা হয়েছে ‘ফাতেমা রোড’।
ফাতেমার দাদার বয়স ৬৫ বছর। তার ২ ছেলেই মারা গেছেন। বর্তমানে ৩ মেয়ে আছে। তাদের সবারই আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। তবে ফাতেমার ফুপুরা নিয়মিত তার খোজখবর রাখেন। ঈদুল আযহার ঠিক পরের দিন সর্বশেষ ফাতেমাকে ঢাকায় দেখতে গিয়েছিলেন ফাতেমার দাদা-দাদী। ফাতেমা এ সময় তার বাবা-মার কথা জিজ্ঞেস করেন তারা কেমন আছেন।
ঢাকার আজিমপুরের ছোট মনির নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিনের সাথে কথা বলে সমকাল। তিনি জানান, জন্মের কয়েকদিন পর থেকেই ফাতেমা তাদের এখানেই আছে। দেখতে দেখতে তার বয়স চার বছর হয়ে গেল। অন্য সকল স্বাভাবিক শিশুর মতই তার বেড়ে ওঠা। সব শিশুদের মতোই তার পড়ালেখা খেলাধুলা ও খাবারদাবারের কোন কমতি নেই এখানে। নিয়মিত শিক্ষক এবং ধর্মীয় শিক্ষকের মাধ্যমে ফাতেমার পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্য সব শিশুদের মতই হেসে খেলে বড় হচ্ছে সে। সরকারি সাধ্য অনুযায়ী ও তার চাহিদা মত সবকিছু ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ছোট মনি নিবাসে বর্তমানে ছয় বছর এর কম বয়সী ৩৭ জন ছেলে মেয়ে আছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফাতেমার ৬ বছর পূর্ণ হলে তাকে সরকারি শিশু পরিবার বালিকায় স্থানান্তর করা হবে। তবে সেক্ষেত্রে তার পরিবার যদি তাকে নেয়ার জন্য আবেদন জানায় তবে সেটি সরকার বিবেচনা করবে।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান এবং স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকেও নানা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ফাতেমার দাদার দোকানে ১০ হাজার টাকার মালামাল, বাড়ি নির্মাণের জন্য টিন এবং বড় দুই ভাই-বোনের স্কুলের বেতন মওকুফের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারটির ভরণপোষণের সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
আজ ফাতেমার জন্মের চার বছর পূর্ণ হওয়ার এই দিনে ময়মনসিংহের ত্রিশালের রায়মণি গ্রামের বাড়িতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। ফাতেমার দাদা জানান, পাড়া-প্রতিবেশী ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে একটু খিচুড়ি রান্না করে দোয়া পড়ানো হবে। এর মাধ্যমে প্রয়াত ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতনির আত্মার মাগফিরাত এবং বেহেশত নসিবের প্রার্থনা করবেন তারা।
প্রসঙ্গত ২০২২ সালের ১৬ জুলাই শনিবার বিকেলে ত্রিশাল উপজেলায় কোর্ট ভবন এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ট্রাকের চাপায় মারা যান ত্রিশালের রায়মনি গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম, তার অন্তঃসত্তা স্ত্রী রত্না বেগম, ছয় বছরের মেয়ে সানজিদা। ঘটনার সময় নিহত মায়ের পেট ফেটে ওই নবজাতকের জন্ম হয়। পরে শিশুটির নাম রাখা হয় ফাতেমা। তাকে আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসে রাখা হয়েছে। সেদিন মেয়ে সানজিদার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসেছিলেন বাবা-মা। ফেরার পথে ঘটেছিল দুর্ঘটনা। মর্মান্তিক এই ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। সে সময় পরিবারটিকে আর্থিক সাহায্য দিতে এগিয়ে আসেন অনেকে।

