শীতের সকালের নরম রোদে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার হাওরগুলো যেন নতুন করে জেগে উঠেছে। যতদূর চোখ যায়, শুধু হলুদ আর হলুদ। সরিষা ফুলে ঢাকা বিস্তীর্ণ মাঠ দেখে মনে হয়, প্রকৃতি নিজ হাতে হলুদের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে।
বাতাসে দুলতে থাকা ফুলের ফাঁকে ফাঁকে মৌমাছির গুঞ্জন আর মাঠের আইলে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষকদের চোখ-মুখে একরাশ আশা। এ যেন শুধু ফসলের মাঠ নয়, বরং কৃষকের স্বপ্নের রাজ্য।
একসময় আমন ধান কাটার পর তাড়াইলের বেশির ভাগ হাওর এলাকা পড়ে থাকত অনাবাদি। পানিতে ডুবে যাওয়া জমিতে চাষের সুযোগ না থাকায় কৃষকরা বসে থাকতেন পরবর্তী মৌসুমের অপেক্ষায়। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। সেই জমিতেই শীত মৌসুমে সরিষা চাষ করে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে তাড়াইলের কৃষক সমাজে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে তাড়াইল উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে সরিষা আবাদে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১,৭২০ হেক্টর জমি। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের ব্যাপক সাড়া ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে সরিষা আবাদ হয়েছে ২,৩৩১ হেক্টর জমিতে। এটি উপজেলার কৃষিতে এক নতুন রেকর্ড হিসেবে ধরা হচ্ছে।
তালজাঙ্গা, জাওয়ার, ধলা, দিগদাইর, রাউতি, দামিহা ও তাড়াইল সদর ইউনিয়নের হাওর এলাকাগুলো এখন সরিষার হলুদ ফুলে একাকার। সরেজমিন দেখা গেছে, মাঠে মাঠে কৃষকরা দলবেঁধে ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরিষা চাষের মূল আকর্ষণ হলো এর স্বল্প সময় ও কম খরচ। বীজ বপনের মাত্র ৬৫ থেকে ৭০ দিনের মধ্যেই সরিষা ঘরে তোলা যায়। সেচের তেমন প্রয়োজন নেই, ফলে উৎপাদন খরচও কম।
সবচেয়ে বড় সুবিধা, সরিষা তোলার পর একই জমিতে বোরো ধান আবাদ করা যায়। এতে একই জমিতে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি ফসল উৎপাদন করে কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
সরিষা তোলার পর অবশিষ্ট সরিষা গাছ স্থানীয় কৃষকদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির উৎস হয়ে উঠেছে। ক্ষেত থেকে সরিষা সংগ্রহের পর গাছগুলো শুকিয়ে বাড়িতে এনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে রান্নার খরচ কমছে, পাশাপাশি জমি পরিষ্কার করতেও সুবিধা হচ্ছে। সরিষা গাছ দ্রুত শুকিয়ে যায় এবং ভালোভাবে আগুন ধরে, ফলে রান্নার কাজে কাঠ বা অন্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমে আসে।
তালজাঙ্গা ইউনিয়নের আড়াইউড়া গ্রামের কৃষক আবদুল ছমেদ বলেন, আগে আমন ধান কাটার পর জমি ফাঁকা থাকত। এখন সরিষা চাষ করে সেই সময়টাও কাজে লাগাতে পারছি। সেচ লাগে না, খরচও কম। দুই মাসের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা যায়। সরিষা বিক্রি করে যে টাকা পাই, তা দিয়েই বোরো ধানের সার ও তেল কেনা সম্ভব।
রাউতি ইউনিয়নের কৃষক আশরাফও বলেন, সরিষা না করলে জমি পতিত পড়ে থাকত। এখন সেই জমিই আমাদের বাড়তি আয়ের উৎস।
উপজেলা কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তারা জানান, চলতি মৌসুমে কৃষকরা টরি-৭, বারি সরিষা-১৪ ও ১৭, বিনা সরিষা-৯, ১১ ও ১৮ জাতের সরিষা আবাদ করেছেন। এসব জাত স্বল্প মেয়াদি, রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং ফলনও ভালো। ফলে কৃষকদের মধ্যে এসব জাতের প্রতি আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ বিকাশ রায় রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরিষা একটি গুরুত্বপূর্ণ তেলজাতীয় ফসল। স্বল্প সময়ে কৃষক যেন বেশি লাভ পান, সে জন্য আমরা মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে তাড়াইল উপজেলায় সরিষার বাম্পার ফলন নিশ্চিতভাবেই হবে। সরিষা আবাদ বাড়লে দেশীয় তেল উৎপাদনও বাড়বে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।
সরিষার হলুদ ফুলে ভরে ওঠা তাড়াইলের হাওর এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং বদলে যাওয়া কৃষির গল্পও বলে। একসময় যে হাওর ছিল নীরব ও ফাঁকা, আজ সেখানে কর্মচাঞ্চল্য, আশা আর সম্ভাবনার রং লেগেছে।
কৃষকেরা বিশ্বাস করেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে তাড়াইল উপজেলা ভবিষ্যতে সরিষা উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পাবে। হলুদ ফুলের দোলায় দোল খেতে খেতে এগিয়ে যাবে হাওরের কৃষকের স্বপ্ন।



