ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় উচ্চ বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিক্ষক থেকে অভিজ্ঞতা ছাড়াই অনৈতিক সু্বধিা নিয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হয়েছেন মোহাম্মদ আবু ওবায়দা। তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফ্যাসিস্ট সরকারের সংসদ সদস্য অ্যাড. মোসলেম উদ্দিনের অনৈতিক অর্থ লেনদেনের ক্যাশিয়ার ছিলেন মোহাম্মদ আবু ওবায়দার শ্বশুর। সেই ক্ষমতাবলে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হয়েছেন তিনি। অবৈধ নিয়োগে ১৭ বছর সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন মোহাম্মদ আবু ওবায়দা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্ত।
বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনের ইট, গ্রিল টিনসহ বিভিন্ন মালামাল নিজের বাড়িতে ব্যবহার করছেন। বিদ্যালয় পরিচালনা করতে এহেন কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই যা তিনি করেননি। এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে বিদ্যালয়ের ভিতরে বাহিরে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
ফুলবাড়িয়া সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু ওবায়দার বিরুদ্ধে এমন দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ্য করা হয়, ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত সরকারি প্রতিষ্ঠান ফুলবাড়িয়া সরকারি মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। ওই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু ওবায়দা অত্র বিদ্যালয়ে ২০০১ সালের ২৬ মার্চ কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন।
পরবর্তীতে পুর্ণ অভিজ্ঞতা ছাড়াই ২০০৯ সালে ১০ অক্টোবর সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এখানে উল্লেখ্য যে, সরকারি বিধি মোতাবেক কোনো শিক্ষক সহকারী প্রধান শিক্ষক হতে ১২ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। তবে, কম্পিউটার শিক্ষক মোহাম্মদ আবু ওবায়দা ২০০১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কম্পিউটার শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। অতএব মোহাম্মদ আবু ওবায়দা ৮ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তৎকালীন তার শ্বশুর শামছুদ্দিন বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। তার শ্বশুরের ক্ষমতাবলে অবৈধভাবে তিনি বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।
পরবর্তী ২০১১ সালের ১ আগস্ট বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য আব্দুর রহমান ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদের প্রার্থী মো. মোখলেছুর রহমান বাদী হয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত মোহাম্মদ আবু ওবায়দার নিয়োগের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ১২৮/১১।
এমতাবস্থায় বিদ্যালয়টি ২৯ অক্টোবর ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয়করণ হলে তিনি মামলার তথ্য গোপন করে বিশেষ তদবিরের মাধ্যমে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ নিয়ে বহাল থাকেন। সরকারি গেজেটের ৭ ধারায় উল্লেখ বেসরকারি আমলে কাম্য যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে তার কাম্য যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা না থাকায় নিয়োগ অবৈধ।
এ ছাড়া মোহাম্মদ আবু ওবায়দা বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে সেচ্ছাচারিতা, অসততা ও আর্থিক অনিয়ম করে যাচ্ছেন। তিনি বিদালয়ের শিক্ষকদের মতামত ও পরামর্শ তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছা স্বাধীন সকল শিক্ষকের অগোচরে একক সিদ্ধান্তে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বাস ভবন ও বিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্রধান ফটক ভেঙে ফেলে এবং এর ইট ও গ্রিল নিজ বাসায় ব্যবহার করেন।
বিদ্যালয়ের ভবনে চুনকাম, রংকরণ, বাউন্ডারির দেয়াল পুনঃনির্মানের নামে ভুয়া ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি অনুষ্ঠানের নামে খরচ বর্হিভুত ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন। বিদ্যালয়ের কেচি গেইট, লোহা, টিন ও অভ্যন্তরীন পরীক্ষার উত্তরপত্রসহ পুরাতন মালামাল শিক্ষকদের অগোচরে বিক্রয় করে অর্থ আত্মসাৎ করে আসছেন।
সুত্র জানায়, মোহাম্মদ আবু ওবায়দা ২০০১ সালে কম্পিউটার হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। পরর্র্বতীতে ২০০৯ সালের কম্পিউটার শিক্ষক পদ থেকে অব্যাহতি নিয়ে সহকারী প্রধান হিসেবে নিয়োগ হন। এদিকে, কম্পিউটার শিক্ষক থেকে পদত্যাগ করার পর ফরিদা আক্তার নামে একজনকে কম্পিউটার শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে, মোহাম্মদ আবু ওবায়দা সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে থেকেও অবৈধভাবে ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত কম্পিউটার শিক্ষক পদের বেতন উত্তোলন করেন। তবে, তার সহকারী শিক্ষক পদের নিয়োগ অবৈধ হওয়ায় তিনি কোনো বেতন উত্তোলন করতে পারেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বলেন, ‘আমরা জানি সহকারী প্রধান শিক্ষক হলে ১২ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। কিন্ত মোহাম্মদ আবু ওবায়দা অনৈতিক পন্থা অবলম্বর করে সহকারী প্রধান শিক্ষক হয়েছিলেন। এভাবেই ১৭ বছর তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ বিষয়ে অভিযোগ ও মামলা হয়েছে। কিন্তু কোনোকিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের এহেন দুর্নীতি নেই, যা তিনি করেননি।’
জানতে চাইলে সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু ওবায়দা বলেন, ‘অভিজ্ঞতা নেই, এটা ঠিক আছে। কিন্তু পরিপত্রের মাধ্যমে আমি সহকারী প্রধান শিক্ষক হয়েছি। তবে, আপনি যদি আমার সাথে দেখা করে কথা বলতেন, তাহলে আমি বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে পারতাম।’
ময়মনসিংহ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহছিনা আক্তার বলেন, ‘প্রথমে উপজেলা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে হবে। সেখানে কাজ না হলে পরে আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব।’



