হাওরের আকাশে ঘন মেঘ, বাতাসে অস্থিরতা—এই শঙ্কা নিয়েই প্রতিদিন মাঠে নামেন কৃষকেরা। কিন্তু এবার তাদের লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছে শ্রমিক ও জ্বালানি সংকট। হাওরের বিস্তীর্ণ জমিতে থেমে থাকা পানি যেন নেত্রকোনার কলমাকান্দার কৃষকের জীবনে নতুন এক অনিশ্চয়তার নাম।
টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিতে নেত্রকোনার এই সীমান্তবর্তী উপজেলার হাওরাঞ্চলে নেমে এসেছে আগাম বন্যার আতঙ্ক। পানির চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেদী, তেলেঙ্গাসহ একাধিক বিলের পাকা বোরো ধানের শীষ ইতোমধ্যে পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আধাপাকা ধান দ্রুত কাটার নির্দেশনা ও মাইকিং করা হলেও বাস্তবতায় কৃষকেরা পড়েছেন চরম বিপাকে। পর্যাপ্ত শ্রমিক না পাওয়া এবং জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাওরের শতভাগ ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পুরো ফসল ঘরে তোলা নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় শঙ্কা।
এদিকে সোনাডুবি, মহিশাশুরা, গোরাডোবা ও আঙ্গাজুরা হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে এসব হাওরের নিচু জলাবদ্ধতায় জমি পানির নিচে যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২১ হাজার ৬৫ হ্যাক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে রয়েছে ৪ হাজার ৬৩০ হ্যাক্টর জমি। এসব জমির ধান প্রায় কাটার উপযোগী হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, বাস্তবে এই হার আরও কম—প্রায় ২০ শতাংশ।
কৃষকেরা জানান, হারভেস্টার থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক মেশিন ঠিকভাবে কাজ করতে পারছে না। ফলে ধান কাটার গতি কমে গেছে। একদিকে আগাম বন্যার চাপ, অন্যদিকে বজ্রপাতের ভয়—সব মিলিয়ে হাওরের মাঠে কাজ করা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সময়মতো ধান ঘরে তুলতে না পারলে বছরের পুরো পরিশ্রম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশরগ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, ‘তিন একর জমিতে ধান করেছি। এখন পানি উঠেছে। শ্রমিক পাচ্ছি না, মেশিনও ঢুকতে পারছে না। খরচ বেশি, ধানের দাম কম—আমরা খুব বিপদে আছি।’
হারভেস্টার মালিক আজিজুল হক বলেন, ‘তেল না থাকলে মেশিন চলে না। অনেক সময় অর্ধেক দিন কাজ করেই বন্ধ রাখতে হয়।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, কয়েকটি হাওরে ইতোমধ্যে পানি ঢুকেছে এবং প্রায় এক হাজার হ্যাক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছেন এবং হারভেস্টার সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে। তবে শ্রমিক সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে কলমাকান্দার হাওরে এখন কৃষকের জীবন এক কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে। এটি শুধু ফসল হারানোর গল্প নয়—এ যেন প্রকৃতি, সময় আর অভাবের ত্রিমুখী চাপে এক মৌসুমি সংগ্রাম।


