রাজশাহীর তানোরে কেআরবি নামের একটি ইটভাটায় অবাধে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ, উড়ছে বিষাক্ত ধোঁয়া। এতে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ ও কৃষি ফসল, বেকায়দায় পড়েছে পাশের স্কুলশিক্ষার্থীরা। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কৃষিজমির ওপরের উর্বর টপসয়েল।
উপজেলার বাঁধাইড় ইউনিয়নের ঝিনাখৈর মাঠে তিন ফসলি কৃষিজমিতে ইটভাটা নির্মাণ করে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্ষমতার দাপটে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে প্রকাশ্যে দিন-রাত সমানতালে চলছে এই ভাটা। পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দেদারসে ভাটা পরিচালনা করছে কর্তৃপক্ষ।
দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া, জেল-জরিমানা করা হলেও রহস্যজনক কারণে কেআরবি ইটভাটায় কোনো অভিযান চালানো হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ওই এলাকার তিন ফসলি কৃষিজমির টপসয়েল কেটে নেওয়া হলেও প্রশাসন নির্বিকার রয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন কৃষিজমির উর্বরতা কমছে, অন্যদিকে ফসলসহ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়ছে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযান পরিচালনা করে ইটভাটা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও পরিবেশবিদরা।
জানা গেছে, উপজেলার বাঁধাইড় ইউনিয়নের ঝিনাখৈর কৃষি মাঠে বিগত প্রায় ১২ বছর ধরে একটি অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠেছে। ভাটার চারদিকে রয়েছে ফসলি কৃষিজমি। প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ বিঘা তিন ফসলি জমি লিজ নিয়ে ভাটা তৈরি করা হয়েছে। ভাটায় আশপাশের এলাকার কৃষিজমির টপসয়েল কেটে ইট তৈরি করা হয়। কয়লার পরিবর্তে কাঠ পোড়ানো হয়। ভাটায় কৃষিজমির টপসয়েল কেটে গর্ত করে জমা করে রাখা আছে। প্রতিদিন টনের পর টন কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।
ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে কৃষি ফসল প্রায় হয় না বললেই চলে। নামমাত্র ফসল উৎপাদন করতে পারেন ওই এলাকার কৃষকরা। ভাটার মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় কৃষকরা ভয়ে কিছু বলতে পারেন না। একপ্রকার বাধ্য হয়েই জমি লিজ দিতে হয়েছে কৃষকদের। এমনকি জমির টপসয়েল কাটতে বাধা দিলে রাতের আঁধারে লাঠিসোঁটা নিয়ে ভাটার লোকজন মাটি কাটে। এখানেই শেষ নয়, সাঁওতাল পল্লির ১২-১৪ বছরের শিশুরা ভাটায় স্বল্পমূল্যের মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
এর ফলে শিশুরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। স্কুলে না গিয়ে ভাটায় কাজ করে ওই এলাকার বেশির ভাগ শিশু।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভাটার পশ্চিম পাশে গ্রাম ও কৃষিজমি, পূর্ব পাশে হাঁপানিয়া যাওয়ার রাস্তা। উত্তরে রয়েছে কৃষিজমি, দক্ষিণেও রয়েছে কৃষিজমি। জমিগুলোতে সরিষা ও গমের আবাদ দেখা যায়। ভাটার সংলগ্ন দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ঝিনাখৈর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এর মাঝখানেই রয়েছে ভাটার চিমনি। সেই চিমনি দিয়ে দিন-রাত অবিরাম বিষাক্ত ধোঁয়া বের হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, ভাটার কারণে তারা চাষাবাদ করতে পারছেন না। ভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় শুধু ফসল নয়, গাছপালারও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু কোনো উপায় নেই, ভাটার মালিকরা প্রভাবশালী। এ কারণে তাদের ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারে না। ভাটা বন্ধ না হলে মাঠের পুরো জমিই ভাটা মালিকদের দিতে হবে, কারণ চাষাবাদ করে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। ধীরে ধীরে কৃষকরা চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
এ ছাড়া এলাকার শিশুরা স্কুলে যেতে চায় না, তারা প্রতিদিন ভাটায় কাজ করে। সকাল আটটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত এবং বিকেল তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত মাত্র ৫০ টাকা মজুরিতে শিশুরা কাজ করে।
এলাকার কৃষিজমির টপসয়েল কেটে উজাড় করা হচ্ছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ঝিনাখৈরের কেআরবি ভাটায় কোনো অভিযান হয় না। এত অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও পরিবেশ অধিদপ্তর বা প্রশাসন কোনো অভিযান পরিচালনা করছে না। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, শিশুরা শ্রম দেওয়ায় স্কুলে যেতে পারছে না, ফলে অভিভাবকরাও পড়েছেন বেকায়দায়। অকালে ঝরে পড়ছে শিশুরা।
এবিষয়ে জানতে কেআরবি ভাটার ম্যানেজার জুলহাসকে ফোন দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।
ভাটার দায়িত্বে থাকা হাজী কালাম জানান, এই ভাটা রাজশাহী সমিতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বছরে কাস্টমসকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয়। যেখানে যা প্রয়োজন তা দিয়েই ভাটা চালানো হচ্ছে। শিশু শ্রম, কাঠ পোড়ানো ও কৃষিজমির টপসয়েল কাটা বৈধ কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমিতির নির্দেশনা অনুযায়ী যেভাবে ভাটা চালানো হয়, এখানেও সেভাবেই চলছে। তিনি সমিতিতে কী দায়িত্বে আছেন জানতে চাইলে জানান, মালিক রফিকুল সদস্য হিসেবে আছেন, আর তিনি নিজে দেখভাল করেন। মালিকের মোবাইল নম্বর চাইলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, সাক্ষাতে কথা হবে, তিনি এখন নামাজে যাবেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিব শংকর বসাক জানান, কৃষিজমির টপসয়েল কাটার কোনো সুযোগ নেই। অতি দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাঈমা খানকে ভাটার বিষয়ে অবহিত করা হলে তিনি লোকেশন জেনে দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাছনিমা খাতুনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করে ভাটার বিষয়ে জানানো হলে তিনি বলেন, দ্রুত ভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন