ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

রাজশাহীতে তেলের খোঁজে কৃষকের ঘুম নেই, ফসল নিয়ে চিন্তিত

রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ০৩:৩১ পিএম
রাজশাহীতে তেলের পাম্পে পাম্পে সেচ যন্ত্র নিয়ে ঘুরছেন কৃষক। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

রাজশাহীতে জ্বালানি তেলের সংকটে সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। সেচের পানি না পেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে ফসলের মাঠ, আর তেলের সন্ধানে কৃষকদের ছুটতে হচ্ছে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়। 

কেউ কেউ ১৩ থেকে ২০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ঘুরছেন। আবার কেউ সেচের পাম্প কাঁধে নিয়েও ঘুরছেন। তীব্র এই সংকটে পটোল, মরিচ, বোরো ধান, পান, পেঁয়াজ ও পাটসহ বিভিন্ন ফসল হুমকির মুখে পড়েছে, বাড়ছে দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তা।

বুধবার (৮ এপ্রিল) পবা উপজেলার শাহ্ মখদুম এয়ারপোর্ট এলাকার মেসার্স হাবিব ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তেলের অপেক্ষায় ছিলেন মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল বারি। নিজের সেচযন্ত্র সঙ্গে নিয়ে তিনি পেট্রোলের সন্ধানে সেখানে আসেন।

কৃষক আব্দুল বারি জানান, তাদের এলাকায় ডিজেল পাওয়া গেলেও পেট্রোল মিলছে না। এতে সেচযন্ত্র চালানো বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। পটোলের আবাদ, মরিচের আবাদ, বোরো ধান সব রোদে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে পটোলের গাছ মরে যাচ্ছে স্রেফ সেচের অভাবে।’

তিনি আরও জানান, প্রতিদিন তেলের খোঁজে ঘুরে কৃষকদের সময়, শ্রম ও টাকা সবই নষ্ট হচ্ছে। নিজ এলাকায় তেল না পেয়ে নিরুপায় হয়ে তিনি সেচযন্ত্র মাথায় করে পাম্পে এসেছেন, শুধু ফসল বাঁচানোর আশায়।

একই স্টেশনে তেল নিতে আসা আরেক কৃষক সিহাব বলেন, ‘বাড়ির আশপাশের দোকান বা পাম্পে তেল না পেয়ে তাদের দূর-দূরান্তে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি যাতায়াত খরচও গুনতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আগে আমরা বাড়ির কাছেই তেল পেতাম, সেখান থেকে নিয়ে গিয়ে সেচ দিতাম, সুবিধা হতো। এখন গাড়ি নিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ করে এখানে আসতে হচ্ছে।’

কৃষক সিহাবের অভিযোগ, এত দূর থেকে এসেও প্রয়োজন অনুযায়ী তেল মিলছে না। তিনি বলেন, ‘১৩ কিলো দূর থেকে আসছি তেল নিতে। এসে দেখি মাত্র ৩০০ টাকার তেল দিচ্ছে। এই তেল দিয়ে আমাদের কি চলবে?’

তিনি জানান, পাঁচ কাঠা জমিতে সেচ দিতে গেলেই ৩০০ টাকার তেল শেষ হয়ে যায়। এতে পান, পাটসহ বিভিন্ন ফসলের সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান মোহনপুরের মৌমাছি ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের কৃষক মোজাফফর মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘পানের বরজ, পেঁয়াজ, পটল ও পাটের আবাদে সেচ দিতে পেট্রোল জরুরি। কিন্তু ১৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পাম্পে এসে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৩০০ টাকার তেল।’

কৃষক মোজাফফর মণ্ডল বলেন, ‘১৩ কিলো দূর থেকে আইসা আমরা ৩০০ টাকার তেল পেলাম। এই ৩০০ টাকার তেলে আমার মাত্র পাঁচ কাঠা মাটি ভেজাতেই শেষ হয়ে যাবে। তাহলে আমার চলবে কীভাবে?’ তিনি জানান, গম কাটার পর এখন পাটের জমিতে সেচ দিয়ে বপনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জ্বালানির অভাবে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে। তার ভাষায়, ‘বর্তমানে যে তেলের সংকট দেখা দিয়েছে, এতে আমার এবার কোনো মতেই পাট বোনা হবে না।’

কৃষকদের অভিযোগ, জ্বালানির এই সংকট এখন শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তির বিষয় নয়; এটি কৃষি উৎপাদনের ওপরও সরাসরি আঘাত হানছে। সময়মতো সেচ দিতে না পারলে চলতি মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকেরা।

তবে পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পবা উপজেলার মেসার্স হাবিব ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক রাকিব বলেন, ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যে পরিমাণ তেল বরাদ্দ আসছে, তা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রত্যয়নপত্র যাচাই করে কৃষকদের মধ্যে দেওয়া হচ্ছে।

রাজশাহী পবা উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও ওই ফিলিং স্টেশনের ট্যাগ কর্মকর্তা মো. সালাহ উদ্দিন আল মামুন বলেন, কৃষিকাজের সুবিধার জন্য কৃষি কার্ড ও প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন চাহিদা অনুযায়ী কৃষকদের তেল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, সেই চেষ্টা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। কৃষকেরা বলছেন, দ্রুত পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে সেচব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়বে এবং চলতি মৌসুমে কৃষিখাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই ফসল বাঁচাতে এবং উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে অবিলম্বে জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।