ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

কাপ্তাই হ্রদের পানি না কমায় বোরো ধান চাষে হুমকি

রাজস্থলী (রাঙামাটি) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫, ১২:০৭ পিএম
কাপ্তাই হ্রদ। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানি নির্ধারিত সময়ে না কমানোয় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বোরো মৌসুমের ধান চাষ। নৌযান চলাচল ও নাব্য বজায় রাখার অজুহাতে পানি ধীরগতিতে নামানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন হ্রদ সংলগ্ন বিভিন্ন উপজেলার কৃষক ও স্থানীয়রা।

ফলে জলে ভাসা জমিতে তৈরি করা বীজতলা (জালা ধান) এখনো পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে, যা কৃষকদের চরম উদ্বেগে ফেলেছে।

কাপ্তাই বাঁধের ওপরের এলাকার মানুষ মূলত জলে ভাসা জমির ওপর নির্ভরশীল। এসব জমিতে বছরে একবারই ধান চাষ করা সম্ভব। সেই একমাত্র সুযোগটি হাতছাড়া হলে খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাঙামাটি সদর উপজেলার কুতুবদিয়া, ধুপ্যাচর, দীঘলছড়ি, আমতলা, ভালাছড়ি, মাইত কাবা ছড়া, গাইতবান, সাক্রাছড়ি ও শেলছড়ি এলাকায় অনেক কৃষক আগেই বীজতলা তৈরি করেছেন। তবে জমিগুলো এখনো পাঁচ থেকে সাত হাত পানির নিচে ডুবে রয়েছে। ফলে ধান রোপণ শুরু করা যাচ্ছে না।

ধুপ্যাচর এলাকার কৃষক আকাশ মার্মা বলেন, গত বছর ২৫ নভেম্বর বীজতলা করেছিলাম, এবার করেছি ১২ ডিসেম্বর। কিন্তু এখনো পানি নামছে না। কবে রোপণ করব, কবে ধান ঘরে তুলব কিছুই বুঝতে পারছি না। জলে ভাসা জমিতে আমরা বছরে একবারই চাষ করতে পারি। যদি সরকার ঠিক সময়ে পানি না কমায়, তাহলে আমরা বাঁচবো কীভাবে?

বাজার এলাকার কৃষক মো. ইউনূস বলেন, শোনা যাচ্ছে প্রতিদিন এক ইঞ্চি করে পানি কমছে। কিন্তু বাস্তবে কোথাও কমছে না। আমি নিজে প্রতিদিন মেপে দেখি। দ্রুত পানি না কমালে বরো ধানের রোপণ করা সম্ভব হবে না। দেরিতে রোপণ করলে বর্ষায় ধান তলিয়ে যাবে, খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।

একই অভিযোগ করেছেন বহলতলী, গাইতবান, সাক্রাছড়ি ও শামুকছড়িসহ আশপাশের এলাকার কৃষকরাও। যদিও সদর এলাকায় নিত্যরঞ্জন চাকমা, সুমিত রঞ্জন চাকমা, ক্যহ্লা মার্মা ও প্রহর চাকমাকে অল্প পরিসরে ধান রোপণ করতে দেখা গেছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক বলেন, বোরো মৌসুমে এই সময়টাই ধান রোপণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এখানকার জমিগুলো সমতলের মতো নয়; পানি কমার সঙ্গে সঙ্গেই রোপণ করতে হয়।

কিন্তু পানি না কমায় কৃষকরা রোপণ তো দূরের কথা, অনেক জায়গায় চর না ওঠায় বীজ বপনও করতে পারছে না। আমরা এক মাস আগে বীজ ও সার বিতরণ করেছি, কিন্তু পানি সমস্যায় সব ব্যাহত হচ্ছে।

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি দেওয়ান বলেন, কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রায় ৫৪ হাজার একর জমি পানির নিচে চলে গেছে। বিলাইছড়ি উপজেলাতেই প্রায় পাঁচ হাজার একর জলে ভাসা জমি রয়েছে। এখানকার মানুষের একমাত্র ভরসা এই জমি।

এখন হ্রদে আগের মতো মাছও পাওয়া যায় না। বছরে একবার ধান চাষের সুযোগ নষ্ট হলে মানুষ একেবারে পথে বসবে। তাই কর্তৃপক্ষের উচিত নির্ধারিত সময়ে পানি কমানো ও বাঁধ বন্ধ করা।

পিডিবির ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান মুঠোফোনে জানান, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলা পর্যায়ের এক সভায় প্রস্তাব করা হয়েছিল, নির্বাচন পর্যন্ত যেন ব্যাপকভাবে পানি না কমানো হয়, যাতে নৌপথে যোগাযোগ স্বাভাবিক থাকে। সে কারণেই পানি ধীরগতিতে কমানো হচ্ছে।

তবে এ সময়ে পানির উচ্চতা ১০৫ ফিট এমএসএল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তা ৯৮ ফিট এমএসএলে রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।

কেবল বিলাইছড়ি নয়, কাপ্তাই বাঁধের ওপরে থাকা জুরাছড়ি, বরকল, লংগদু, বাঘাইছড়ি ও নানিয়ারচর উপজেলার লাখো কৃষক একই সংকটে রয়েছেন। সঠিক সময়ে ধান চাষ নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী এবং পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার সুদৃষ্টি কামনা করেছেন স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই কৃষির স্বার্থে কাপ্তাই হ্রদের পানি ব্যবস্থাপনায় জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।