ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

যেভাবে গডফাদারদের আস্তানায় পরিণত হলো জঙ্গল সলিমপুর

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মার্চ ৯, ২০২৬, ০৯:৫৭ পিএম
ছবিটি এ আই দিয়ে বানানো।

জঙ্গল সলিমপুর নামটি শুনলেই গা শিউরে ওঠে। কথাটি রূপকথার গল্পের মতো মনে হলেও বাস্তবে এটি তার চেয়েও ভয়ংকর। এলাকাটি পুরোপুরি সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর এসব সন্ত্রাসীদের নেতা ছিলেন ইয়াসিন। তিনি এলাকার প্রতিটি সংযোগস্থলে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়েছিলেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে সেখানে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে কেউ সহজে এই এলাকায় প্রবেশ করতে পারতেন না। সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক কিংবা দিনমজুরের ছদ্মবেশে থাকা তথ্যদাতারা আগেভাগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার খবর পৌঁছে দিতেন।

এক বক্তব্যে এমনই তথ্য দিয়েছিলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আহসান হাবিব পলাশ।

সরকারি বাহিনীর সদস্য না হলেও এলাকাটিতে কিছু মানুষকে অস্ত্র হাতে টহল দিতে দেখা যেত, যেন দেশের ভেতরেই আরেকটি আলাদা দেশ। সরকারি অনুমোদন ছাড়াই এলাকার সব প্রবেশপথে বসানো হয়েছিল বড় বড় লোহার গেট। এমনকি সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য নিজস্ব পরিচয়পত্রও দেওয়া হয়।

এমন ভয়াবহ এলাকাতেই আজ সোমবার (৯ মার্চ) সকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে যৌথ অভিযান শুরু হয়।

দিনভর অভিযানে এখন পর্যন্ত ১৫ জন সন্দেহভাজনকে আটক করেছে পুলিশ, র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী।

আটকের সময় তাদের কাছ থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র, চারটি কার্তুজ, ১১টি ককটেল, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র, ১৯টি সিসিটিভি ক্যামেরা, দুটি ডিভিআর, একটি পাওয়ার বক্স ও দুটি বাইনোকুলার জব্দ করা হয়েছে।

এ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ওই এলাকায় দুটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে বলে জেলা পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

জঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে, এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। প্রশাসনিকভাবে এটি সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও নগরের খুব কাছেই এর অবস্থান। এলাকাটির পূর্ব দিকে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ বোস্তামী থানা রয়েছে। এই এলাকা ছিল সাধারণ মানুষের জন্য একপ্রকার নিষিদ্ধ বা ‘নো-গো জোন’। আগে থেকে অনুমতি না নিলে সেখানে ঢোকার কোনো উপায় থাকে না।

গত ১৯ জানুয়ারি একটি ঘটনার পর জঙ্গল সলিমপুর নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই দিন ‘অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে’ গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে র‍্যাবের একটি দল সেখানে অভিযান চালালে তারা হামলার শিকার হয়। ওই হামলায় র‍্যাবের একজন কর্মকর্তা নিহত হন এবং আরও তিনজন সদস্য আহত হন।

ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, র‍্যাবের ওপর হামলার সময় মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে হামলাকারীদের জড়ো করা হয়। র‍্যাবের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন ওই হামলায় অংশ নিয়েছিল।

যেভাবে গড়ে উঠল জঙ্গল সলিমপুর

নব্বইয়ের দশকে আলী আক্কাস নামের এক ব্যক্তি প্রথম জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন শুরু করেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় তখন সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর পৌঁছানো সহজ ছিল না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আক্কাস নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সরকারি জমি প্লট আকারে বিক্রি করতে থাকেন বলে জানান সীতাকুণ্ড থানার ওসি মহিনুর ইসলাম।

নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আলী আক্কাস একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলেন। এরপর পাহাড় কেটে আরও নতুন নতুন বসতি গড়ে তোলা হয় এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে অবৈধভাবে জমির বেচাকেনা চলতে থাকে। প্লট ক্রেতাদের সংঘবদ্ধ করতে গঠন করা হয় ‘ছিন্নমূল সমবায় সমিতি’। এই সমিতির মাধ্যমেই নিয়মিত চাঁদা তোলা এবং পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হতো।

র‍্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আলী আক্কাস নিহত হন। এরপরই জমি দখল ও প্লট বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তার সহযোগীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। আলী আক্কাসের একসময়ের সহযোগী কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক আলাদা গ্যাং তৈরি করেন। এই দলগুলো পরে জঙ্গল সলিমপুরের বিভিন্ন অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

স্থানীয়রা জানান, আলীনগর এলাকায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ইয়াসিন মিয়ার। তিনি ‘আলীনগর বহুমুখী সমিতি’ নামের একটি সংগঠন পরিচালনা করেন। অন্যদিকে, কাজী মশিউর রহমান ও গাজী সাদেকের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় ‘মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’। মূলত পাহাড়ে বসবাসকারী প্লট ক্রেতারাই এসব সংগঠনের সদস্য।

ওসি মহিনুর জানান, এই দুই সংগঠনের সদস্য মিলিয়ে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস।

জঙ্গল সলিমপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওসি মহিনুর ইসলাম জানান, গত ১৮ মাসে সেখানে অন্তত পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মূলত পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ ও জমি দখলকে কেন্দ্র করেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।