পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হলো ‘অ্যাসেট ভ্যালু বা সম্পদের সঠিক মূল্য না দেখানো এবং অডিটেড অ্যাকাউন্টস সঠিকভাবে তৈরি না করা’। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, যদি ব্যালেন্স শিটগুলো সঠিক হতো, তবে অনেক কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে যেত না এবং পুঁজিবাজারে ধস নামত না।
ফিন্যানসিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) মঙ্গলবার দুপুরে পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এফআরসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসাইন ভুঁইয়া।
সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন ও হিসাব নিরীক্ষা যথাযথভাবে না হওয়াকে দায়ী করে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবেই ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল তার আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। সরকার এফআরসির সক্ষমতা বাড়াতে সজাগ রয়েছে এবং এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা আগামী বাজেটে পাওয়া যাবে। এই সংস্কার পরিকল্পনাগুলো বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অংশ, যা এখন একটি জাতীয় এজেন্ডায় পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার সরাসরি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ‘ডিরেগুলেশন’ বা বিনিয়ন্ত্রণ এবং ‘মার্কেট বেইজড রেগুলেশন’-এ বিশ্বাসী। সরকার চায় না কোনো কিছু ওপর থেকে চাপিয়ে দিতে; বরং পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলো যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই পালন করে। এফআরসি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে সুশাসন নিশ্চিত করবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। ক্ষমতার চরম কেন্দ্রায়ন এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। এর ফলে আর্থিক খাতে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে, কারণ বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া হয়নি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে কার্যত অকেজো করে রাখা হয়েছিল।
আর্থিক খাতের এই নাজুক অবস্থার জন্য অডিটিং ফার্ম, সার্ভেয়ার এবং অ্যাকাউন্টিং ফার্মগুলোর পেশাদারিত্বের অভাবকে দায়ী করে তিনি বলেন, অডিটররা যদি সঠিক প্রতিবেদন দিতেন এবং সার্ভেয়াররা বন্ধকী সম্পত্তির যথাযথ মূল্যায়ন করতেন, তবে ব্যাংক খাতে আজকের এই অচলাবস্থা তৈরি হতো না।
তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হলো অ্যাসেট ভ্যালু বা সম্পদের সঠিক মূল্য না দেখানো এবং অডিটেড অ্যাকাউন্টস সঠিকভাবে তৈরি না করা। যদি ব্যালেন্স শিটগুলো সঠিক হতো, তবে অনেক কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে যেত না এবং পুঁজিবাজারে ধস নামত না।
তার মতে, সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা তদারকি বাড়লে উল্টো দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। এর পরিবর্তে বাজারভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যদি অডিটর, অ্যাকচুয়ারি, সার্ভেয়ার এবং ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তবেই আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বর্তমানে দেশে নিয়মহীনতা ও জবাবদিহিতাহীনতার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকার চায় বাজারকে বাজারের মতো কাজ করতে দিতে, যেখানে কোনো বিকৃতি থাকবে না। তবে এই পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়; তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পেশাদারদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, সঠিকভাবে ব্যালেন্স শিট জমা দেওয়া এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে কর-জিডিপি অনুপাতের বর্তমান নিম্নমুখী অবস্থা পরিবর্তন করা সম্ভব হতো। সরকার চায় পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন আইসিএবি ও আইসিএমএবি কোনো রাজনৈতিক বা সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াই তাদের দায়িত্ব পালন করুক, যাতে ভোক্তারা সঠিক তথ্য পায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে।
সরকার সরাসরি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ‘ডিরেগুলেশন’ বা বিনিয়ন্ত্রণ এবং ‘মার্কেট বেইজড রেগুলেশন’-এ বিশ্বাসী। বাজারভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা একদিকে যেমন ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করে, তেমনি উৎপাদক ও জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে। তাই বাজারকে বাজারের নিয়মেই চলতে দেওয়া উচিত।
অডিট রিপোর্টের স্বচ্ছতা ও পুঁজিবাজারের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে বর্তমানে যে সংকট চলছে, তার জন্য অডিট রিপোর্ট ও ব্যালেন্স শিটের অসংগতিকে দায়ী করা হচ্ছে। আইপিও ছাড়ার সময় অনেক কোম্পানির যে অ্যাসেট ভ্যালু দেখানো হয়েছিল, পরবর্তীতে তার সঙ্গে কোনো মিল পাওয়া যায়নি। পেশাদার অডিটররা যদি সঠিকভাবে তথ্য প্রত্যয়ন করতেন, তবে পুঁজিবাজারে এই বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতো।


