পৃথিবীর সুরক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত ওজোন স্তরকে বাঁচাতে গিয়ে মানুষ অজান্তেই এক ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও রেফ্রিজারেটরে ব্যবহৃত ক্ষতিকর সিএফসি (CFC) গ্যাসের বিকল্প হিসেবে আমরা যেসব গ্যাস ব্যবহার করছি, সেগুলো এখন আকাশ থেকে ‘বিষাক্ত কেমিক্যাল বৃষ্টি’ হয়ে ঝরে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী 'জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স'-এ সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানানো হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানীদের একটি দল এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন। দীর্ঘ ২২ বছরের (২০০০-২০২২) বায়ুমণ্ডলীয় তথ্য এবং উন্নত 'কেমিক্যাল ট্রান্সপোর্ট মডেল' বিশ্লেষণ করে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
প্রকাশিত নিবন্ধ অনুযায়ী, ওজোন স্তর রক্ষাকারী গ্যাসের বিকল্পগুলো এখন বিশ্বজুড়ে 'ট্রাইফ্লুরোঅ্যাসেটিক অ্যাসিড' (টিএফএ) নামক এক দীর্ঘস্থায়ী দূষণ ছড়িয়ে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ (Forever Chemical), কারণ এটি পরিবেশে একবার মুক্ত হলে তা আর কখনোই প্রাকৃতিকভাবে ধ্বংস হয় না।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে বায়ুমণ্ডলে প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ টন টিএফএ জমা হয়েছে। এটি মূলত রেফ্রিজারেটর এবং এয়ার কন্ডিশনারে ব্যবহৃত এইচসিএফসি (HCFC) এবং এইচএফসি (HFC) গ্যাসের ভাঙন থেকে তৈরি হয়। এই গ্যাসগুলো ওজোন স্তরের ক্ষতি না করলেও বায়ুমণ্ডলে ভেঙে গিয়ে বিষাক্ত এসিড তৈরি করে, যা বৃষ্টির মাধ্যমে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসে।
গবেষণাটি একটি 'অ্যাডভান্সড কেমিক্যাল ট্রান্সপোর্ট মডেল' ব্যবহার করে করা হয়েছে। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
উৎস শনাক্তকরণ: শুধু রেফ্রিজারেটর নয়, শল্যচিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যানেস্থেটিক গ্যাস (যা আমরা প্রশ্বাসের সঙ্গে ত্যাগ করি) থেকেও এই কেমিক্যাল তৈরি হচ্ছে।
দূরপাল্লার বিস্তার: মডেলটি দেখিয়েছে যে, শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে নির্গত এই গ্যাস হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে উত্তর মেরুর (আর্কটিক) মতো নির্জন জায়গাতেও পৌঁছে যাচ্ছে। আর্কটিকের বরফের স্তরে বা আইস-কোর-এ টিএফএ-এর উপস্থিতির এটাই প্রথম চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
নতুন প্রযুক্তির শঙ্কা: বর্তমানে গাড়ির এসিতে পরিবেশবান্ধব হিসেবে বাজারজাত করা নতুন গ্যাস (HFO-1234yf) আরও বেশি পরিমাণে টিএফএ তৈরি করছে, যা ভবিষ্যৎ দূষণের মাত্রাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা এই গবেষণায় স্পষ্ট করেছেন যে, টিএফএ কোনো সাধারণ দূষক নয়। এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। যেমন:
জলজ প্রাণের বিপদ: ইউরোপীয় কেমিক্যাল এজেন্সি (ECHA) এটিকে জলজ জীবনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে ঘোষণা করেছে। এটি মহাসাগর ও জলাশয়ে জমা হয়ে বাস্তুসংস্থান নষ্ট করছে। মানুষের শরীরে উপস্থিতি: বিভিন্ন দেশের মানুষের রক্ত এবং প্রস্রাবের নমুনায় এই কেমিক্যালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
প্রজনন স্বাস্থ্যের ঝুঁকি: জার্মানির ফেডারেল অফিস ফর কেমিক্যালস প্রস্তাব করেছে যে, টিএফএ-কে প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা 'টক্সিক টু রিপ্রোডাকশন' হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হোক।
গবেষক দলের প্রধান লুসি হার্ট এবং অধ্যাপক রায়ান হোসাইনি সতর্ক করেছেন যে, এই দূষণটি অদৃশ্য এবং অলক্ষিতভাবে বাড়ছে। একবার বৃষ্টি হয়ে এটি নদী বা সাগরে মিশে গেলে তা আর সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। ২০২৫ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে এই দূষণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশে বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এসি এবং ফ্রিজের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ছে। কিন্তু এই গ্যাসগুলো রক্ষণাবেক্ষণ বা রিসাইক্লিংয়ের কোনো আধুনিক প্রযুক্তি বা সচেতনতা এখানে নেই। ফলে আকাশ থেকে ঝরা এই ‘অদৃশ্য কেমিক্যাল বৃষ্টি’ দীর্ঘমেয়াদে আমাদের ভূগর্ভস্থ পানি, কৃষি জমি এবং আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে।
সূত্র: জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স ও সায়েন্টিফোর্ড ডেইলি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন