ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

তরুণ প্রজন্মের আদর্শিক বিভ্রান্তি নিরসনে ধ্রুপদী ইসলামি দর্শনের ভূমিকা

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ৮, ২০২৬, ১০:৪৯ এএম
তরুণ প্রজন্মের আদর্শিক বিভ্রান্তি নিরসনে ধ্রুপদী ইসলামি দর্শনের ভূমিকা। ছবি : সংগৃহীত

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ পরিচয় সংকট, অস্তিত্ববাদ এবং নাস্তিক্যবাদের (Atheism) চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন বস্তুবাদী দর্শন এবং যুক্তিহীন তথ্যের প্রভাবে অনেক মুসলিম তরুণ তাদের বিশ্বাসের ভিত্তি নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট মোকাবিলায় ধ্রুপদী ইসলামি দর্শন (Classical Islamic Philosophy) এবং ‘ইলমুল কালাম’ বা যুক্তিশাস্ত্রের পুনর্জাগরণ এখন সময়ের দাবি।

১. যুক্তিবাদ ও বিশ্বাসের সমন্বয়
ধ্রুপদী ইসলামি দার্শনিক যেমন আল-ফারাবি, ইবনে সিনা এবং ইমাম গাজ্জালি (রহ.) প্রমাণ করেছেন যে, ওহী (Revelation) এবং বিবেক বা যুক্তি (Reason) পরস্পরবিরোধী নয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপট: আধুনিক নাস্তিক্যবাদ প্রচার করে যে, ধর্ম অন্ধবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু ধ্রুপদী দর্শনের ‘বুরহান’ (Burhan) বা অকাট্য যুক্তি পদ্ধতি ব্যবহার করে স্রষ্টার অস্তিত্ব, মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং পরকালের যৌক্তিকতা তরুণদের সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এটি তাদের মনে বিশ্বাসের একটি শক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করে।

২. ইমাম গাজ্জালি ও সংশয়বাদ নিরসন
তরুণদের মধ্যে বর্তমানে যে ‘অজ্ঞেয়বাদ’ (Agnosticism) বা সংশয় কাজ করে, তার দুর্দান্ত সমাধান পাওয়া যায় ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর দর্শনে।

প্রয়োগ: তিনি তাঁর ‘আল-মুনকিজ মিন আদ-দলাল’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে সংশয় থেকে নিশ্চিত বিশ্বাসের (Yaqin) পথে আসা যায়। আধুনিক তরুণরা যখন তথ্যের গোলকধাঁধায় দিশেহারা, তখন গাজ্জালির দর্শন তাদের শেখায় কোনটি নিছক ধারণা আর কোনটি পরম সত্য।

৩. বস্তুবাদের সীমাবদ্ধতা ও আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা
আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষকে অনেক কিছু দিলেও মনের শান্তি বা জীবনের উদ্দেশ্য দিতে পারছে না। নাস্তিক্যবাদ মানুষকে একটি উদ্দেশ্যহীন মহাবিশ্বের অংশ হিসেবে দেখে।

ইসলামি দর্শনের ভূমিকা: ইবনে আরাবি বা মাওলানা রুমির মতো সুফি-দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে কেবল একটি জৈবিক যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং রুহ বা আত্মার আধার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। এই আধ্যাত্মিক দর্শন তরুণদের অস্তিত্বের শূন্যতা পূরণ করে এবং জীবনকে একটি মহৎ লক্ষ্যের সাথে যুক্ত করে।

৪. আধুনিক নাস্তিক্যবাদের তাত্ত্বিক মোকাবিলা
নাস্তিক্যবাদীরা প্রায়শই ‘শয়তানি সমস্যা’ (Problem of Evil) বা মহাবিশ্বের সৃষ্টি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ধ্রুপদী ইসলামি দর্শনে ‘কাদিম’ (অনাদি) ও ‘হাদিস’ (সৃষ্ট)-এর যে সূক্ষ্ম আলোচনা ইবনে রুশদ বা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) করেছেন, তা বর্তমান সময়ের নাস্তিক্যবাদী প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে সক্ষম। এই দর্শনগুলো তরুণদের শেখায় যে, বিজ্ঞান ‘কীভাবে’ প্রশ্নের উত্তর দিলেও ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর কেবল বিশ্বাসের মাধ্যমেই সম্ভব।

৫. নৈতিক কাঠামো ও সামাজিক শৃঙ্খলা
নাস্তিক্যবাদ বা উদারনীতিবাদের (Liberalism) অনেক শাখা পরম নৈতিকতাকে অস্বীকার করে। ফলে তরুণরা অনেক সময় জীবনবোধ হারিয়ে ফেলে। ইসলামি দর্শনের ‘আখলাক’ বা নীতিশাস্ত্র অংশটি মানুষের জীবনের প্রতিটি কাজের একটি উচ্চতর মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এটি কেবল পরকালের ভয় নয়, বরং মানুষের ইনসানিয়াত বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের পথ হিসেবে দর্শনকে তুলে ধরে।

তরুণদের কেবল ‘নিষেধ’ বা ‘ভয়’ দেখিয়ে বিভ্রান্তি থেকে ফেরানো সম্ভব নয়; বরং তাদের যুক্তিবাদী মনের খোরাক জোগাতে হবে। ধ্রুপদী ইসলামি দর্শন সেই শক্তিশালী হাতিয়ার, যা গত এক হাজার বছর ধরে অগণিত দার্শনিক ও বিজ্ঞানীর বুদ্ধিবৃত্তিক তৃষ্ণা মিটিয়েছে। শিক্ষা কারিকুলাম এবং পপুলার মিডিয়ায় এই দর্শনের চর্চা বৃদ্ধি করলে তরুণ প্রজন্মের আদর্শিক বিচ্যুতি রোধ করা সম্ভব।