ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মাথায় গুলিবিদ্ধ শিশুটি লাইফ সাপোর্টে, টেকনাফ সীমান্তে কী ঘটছে?

বিবিসি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০৮:১০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির জান্তা বাহিনী, আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা গ্রুপগুলোর ত্রিমুখী সংঘাতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সীমান্তের এপারে বাংলাদেশেও। সীমান্তের ওপার থেকে আসা গুলি বা গোলায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের টেকনাফ এলাকায় গুরুতর আহত হয়েছেন একাধিক বাংলাদেশি, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে।

সোমবার সীমান্ত এলাকায় মাথায় গুলিবিদ্ধ ৯ বছরের বাংলাদেশি শিশুটিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেলের আইসিইউ থেকে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মেডিকেল বোর্ড। আর সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে পা হারিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন মোহাম্মদ হানিফ নামে আরেকজন বাংলাদেশি।

বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির লড়াই এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনের ঠিক উল্টো পাশে মংডু শহর দখলের জন্য বিদ্রোহীরা ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে। এবারের সংঘাতে রোহিঙ্গাদের ছোট ছোট গ্রুপ যুক্ত হওয়ায় ওই এলাকার উত্তেজনায় বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে বলেও জানা গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে মঙ্গলবার তলব করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সীমান্তের ওপার থেকে আসা গুলিতে বাংলাদেশি আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে তাকে।

সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা বলছেন, টেকনাফের সীমান্ত গ্রামগুলোতে নিয়মিত মর্টার শেল ও ভারী গোলার বিকট শব্দ শোনা যাচ্ছে।

সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি বেশ অস্থির এবং উত্তেজনাকর বলেও তারা জানান তারা। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট ভয়ের কারণ হয়েছে তাদের জন্য। ওপার থেকে ছুটে আসা গুলি অথবা সীমান্তঘেঁষা এলাকায় পেতে রাখা মাইন আতঙ্কে হোয়াইক্যং, নেপালতলীসহ গ্রামগুলোর বাসিন্দারা।

সীমান্তে তৎপরতা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি। গত তিন দিনে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা ৫৩ জনকে আটক করে পুলিশের হেফাজতে দিয়েছে তারা।

গুলি-মাইনে সীমান্তে আতঙ্ক

মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কক্সবাজারের টেকনাফ হোয়াইক্যং এলাকার বাসিন্দা নয় বছরের হুজাইফা আফনান।

রোববার গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশু হুজাইফাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বলেও জানান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘অপারেশন করে ওই শিশুর মাথার ভেতরে থাকা গুলি বের করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেয়। বাচ্চাটার অবস্থা আশঙ্কাজনক, আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে আছে। তার মাথার যেখানে গুলিটা আটকে আছে সেটা আমাদের এখানে চিকিৎসা সম্ভব নয় তাই ঢাকার নিউরোসায়েন্সে রেফার করা হয়েছে।’

হুজাইফার চাচা মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, শুক্রবার থেকেই সীমান্তের ওপারে ভারী গুলিবর্ষণের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন তারা। ‘আমাদের বাড়ি সীমান্তের পাশেই। রোববার ভোর থেকে গুলির শব্দে শুনছিলাম, পরিবারের সবাই ঘরের মধ্যেই ছিলাম। সকালে ভাইয়ের মেয়ের সঙ্গে কথাও হলো এরপর আমি মাদ্রাসায় চলে গেছি, আধঘণ্টা হয় নাই শুনতেছি এই অবস্থা।’

এদিকে, সোমবার টেকনাফের মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে আহত মাছ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হানিফও চিকিৎসা নিচ্ছেন চট্টগ্রাম মেডিকেলে। মাইনের আঘাতে হানিফের ক্ষতিগ্রস্ত পা কেটে ফেলতে হয়েছে বলে জানান তার ভাই আনোয়ারুল ইসলাম। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘আমগো তো কোনো নিরাপত্তা নাই ভাই, আমরা কি করতাম। বাড়ি ছাইড়া কই যামু, আমার ভাইর পাডাই তো কাইটা ফেলা লাগল।’

আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমার নৌ বাহিনীর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের ‌কারণে এমনিতেই গত কয়েক মাস যাবৎ নাফ নদী কিংবা সমুদ্রের সীমান্তসংলগ্ন অংশে অস্থিরতা চলছে বলে জানান হোয়াইক্যং মডেল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ জালাল। তিনি জানান, মিয়ারমানের ভেতরে গুলির শব্দ শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন তারা। মাঝেমধ্যেই গুলি এবং মর্টার শেল বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরে এসে পড়ছে। ‘সীমান্তে বিজিবির উপস্থিতি আছে, তবে পুরো এলাকায় তো তারা সবসময় থাকে না। ওপার থেকে অনেক সময় গুলির শব্দ পাই আবার দেখি মাঝেমধ্যে অনেকে এপারে চলে আসে।’

সীমান্তে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে

মিয়ানমারের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সীমান্ত এলাকায় তৎপরতা বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি। এ ছাড়া সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে পুলিশ এবং নাফ নদীতে কোস্ট গার্ডের টহল বাড়ানো হয়েছে বলেও জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে থাকার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলছেন, ‘ওপারে যেসব গোষ্ঠী সংঘর্ষে লিপ্ত আছে আমরা তাদের ব্যাপারে অবগত আছি। আমাদের অপারেশনও চলমান আছে।’

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় ৫৩ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে থানায় সোপর্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, ‘সীমান্ত এলাকা থেকে আটক করা ৫২ জনকে মঙ্গলবার আদালতে পাঠানো হয়েছে। বাকি একজন আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলেও জানান তিনি। তার দাবি, টেকনাফের সীমান্ত এলাকায় গত কয়দিনের তুলনায় আজ (মঙ্গলবার) অনেকটা শান্ত। এলাকার মানুষ যাতে আতঙ্কিত না হয় সে জন্য সীমান্তে বিজিবি তৎপর রয়েছে। আমরাও এলাকার মধ্যে বাড়তি পেট্রোলিং করছি।’

সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে বসবাসরত মানুষ যাতে সীমান্তের কাছাকাছি না যায় এ নিয়ে মাইকিং করার কথা জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ‘সীমান্তের খুব কাছে বসবাসরত নাগরিকদের সেখান থেকে সরিয়ে আনা যায় কি না এ নিয়েও ভাবছেন তারা। সরকার কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করছে, আমরাও সীমান্ত এলাকার মানুষকে সচেতন করছি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়াসহ এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছি।’

মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রায় দুই বছর ধরে সংঘর্ষ চলছে। এই রাজ্যের অধিকাংশ শহর ও সীমান্ত এলাকা আরাকান আর্মির দখলে যাওয়ার পর রোহিঙ্গাদের কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীও সেখানে সক্রিয় হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে প্রায়ই কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পাশাপাশি ওপার থেকে ছোড়া গুলি এসে পড়ছে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায়।

এর আগেও বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে গুলি কিংবা পেতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশিদের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে অপহরণের শিকারও হয়েছেন অনেক বাংলাদেশি। সব মিলিয়ে প্রতিবেশি দেশে চলমান সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির প্রভাবে আতঙ্কিত সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকরা।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াও সো মো-কে তলব করে মঙ্গলবার এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মিয়ানমারের দিক থেকে আসা গুলিতে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নে শিশুসহ দুই জন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে বলা হয়েছে যে, বিনা উসকানিতে এভাবে গুলি চালানো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সুসম্পর্কের অন্তরায়।’ বাংলাদেশের তরফ থেকে মিয়ানমারকে এ ঘটনায় পূর্ণ দায় স্বীকারের আহ্বান জানিয়ে সীমান্তে এ ধরনের ঘটনা বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ বলেছে যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যাই ঘটুক না কেন তার প্রভাব যেন বাংলাদেশে মানুষের জীবন ও জীবিকায় না পড়ে সেটা মিয়ানমারকে নিশ্চিত করতে হবে।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে তার সরকার ব্যবস্থা নেবে বলে আশ্বস্ত করেছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। একই সাথে আহত শিশু ও তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি।