ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

বিদেশে যেতে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসার দরজা বন্ধ?

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
ছবিটি এআই দিয়ে বানানো।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বৈশ্বিক ভিসা ব্যবস্থা অভূতপূর্বভাবে কঠোর হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থী, পর্যটক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী এমনকি চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশে যেতে চাওয়া মানুষও এখন একই ধরনের বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন- দীর্ঘ বিলম্ব, অস্বচ্ছ প্রত্যাখ্যান এবং আর্থিক ও প্রশাসনিক শর্ত যা অনেকের পক্ষেই পূরণ করা অসম্ভব। এই পরিস্থিতি আর বিচ্ছিন্ন আমলাতান্ত্রিক সমস্যা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংকট, যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকাশ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এই সংকটকে আরও দৃশ্যমান করেছে। বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা কার্যত স্থগিত হওয়ায় পারিবারিক পুনর্মিলন ও বিবাহভিত্তিক অভিবাসনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়ী ভিসার ক্ষেত্রে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড আরোপ করা হয়েছে।

সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, বাংলাদেশি অভিবাসীদের একটি বড় অংশ সরকারি সহায়তার উপর নির্ভরশীল হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে ভিসা এখন আর শুধু যোগ্যতার বিষয় নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে সম্পদের পরীক্ষায়।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট আন্তর্জাতিকভাবে আরও বেশি সন্দেহের মুখে পড়েছে। নেপাল, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে বাংলাদেশিদের অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এরই মধ্যে তুলনামূলক সহজ গন্তব্য হিসেবে পরিচিত- উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সীমিত বা বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি যেসব দেশ ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধা দিত, তারাও নীরবে প্রবেশের শর্ত কঠোর করেছে।

ইউরোপে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। জার্মানির মতো দেশে ভিসা সাক্ষাৎকারের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশের ঢাকায় দূতাবাস না থাকায় আবেদনকারীদের দিল্লি নির্ভর হতে হয়, কিন্তু ভারতীয় ভিসা সীমিত হওয়ায় সেই পথও প্রায় বন্ধ।

নেদারল্যান্ডসসহ একাধিক দেশ অভিযোগ করেছে, অনেক আবেদনকারী পড়াশোনাকে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে, এর ফলে বৈধ শিক্ষার্থীরাও কঠোর স্ক্রিনিংয়ের শিকার হচ্ছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারও বাংলাদেশিদের জন্য ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, বাহরাইন ও ওমানের মতো প্রধান বাজারগুলো কার্যত বন্ধ।

সৌদি আরব বর্তমানে প্রধান গন্তব্য হলেও ইকামা জটিলতা শ্রমিকদের অনিশ্চয়তায় ফেলছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও কর্মসংস্থানের উপর, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিসা সংকটের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার। ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট, জাল শিক্ষাগত ও অভিজ্ঞতা সনদ এবং দালালনির্ভর আবেদন আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে পর্যটক বা শিক্ষার্থী ভিসায় গিয়ে অবৈধভাবে অবস্থান করার ঘটনাও বাংলাদেশি পাসপোর্টের ঝুঁকি প্রোফাইল বাড়িয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও শাসন সংকট। ২০২৪ সালের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন বিদেশি সরকারের আস্থা আরও কমিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন কর্তৃপক্ষ কেবল ব্যক্তিগত নথিপত্র নয়, একটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেয়।

এই সংকট অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গণ্ডি ছাড়িয়ে যাবে। শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক শিক্ষার সুযোগ হারাবে, শ্রম অভিবাসন কমে গেলে রেমিট্যান্সে চাপ পড়বে এবং বৈধ পথ বন্ধ হলে মানব পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি বাড়বে। হতাশ তরুণ জনগোষ্ঠী সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ধাবিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দায় এককভাবে ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের নয়- উভয়েরই। ব্যক্তি পর্যায়ে ভিসা শর্ত লঙ্ঘন ও জালিয়াতি যেমন দায়ী, তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্বল নথি যাচাই, অকার্যকর কূটনীতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও সমানভাবে দায় বহন করে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টার ভাষায়, এটি পুরো সিস্টেমের ব্যর্থতা।