মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের সামনের ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে এক যুবক কোলে করে একটি শিশুকে নিয়ে ছুটছেন- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই স্থিরচিত্রটি এখন এক জাতীয় শোকের প্রতীক। ছবির সেই নিথর শিশুটির নাম মো. সাদমান, বয়স মাত্র তিন বছর। দীর্ঘ ১০ দিন মরণব্যাধি হামের সঙ্গে লড়াই করে গত মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকালে না ফেরার দেশে চলে গেছে সে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবিটির ক্যাপশনে অনেকেই যুবকটিকে শিশুটির ‘অভাগা পিতা’ হিসেবে বর্ণনা করলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে ভিন্ন তথ্য। শিশু সাদমান ছিল কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা মো. সজীব ও আফরিন মীম দম্পতির একমাত্র সন্তান। আর ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি শিশুটির আত্মীয় রেদোয়ান আহমেদ রাফি।
সাদমানের বাবা সজীব ছেলের মৃত্যুর খবরে বারবার সংজ্ঞা হারানোয়, আত্মীয় রাফি দ্রুত শিশুটির মরদেহ নিয়ে একটি সিএনজি অটোরিকশা খোঁজার জন্য হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে আসেন। ঠিক সেই মুহূর্তটিই ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন এক ফটো সাংবাদিক।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ এপ্রিল অসুস্থ অবস্থায় সাদমানকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। পরে শরীরে র্যাশ দেখা দিলে ১৬ এপ্রিল তাকে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে (হাম ডেডিকেটেড) ভর্তি করা হয়। গত রোববার অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে শিশুটি।
ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হাহাকার করে সজীব বলেন, ‘আমি যখন হাসপাতালে পৌঁছাই, তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে, আমার সাদমান আর নেই।’
ছবিটি ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে দাবি করেছিলেন যে, অ্যাম্বুলেন্স না পেয়েই শিশুটির মরদেহ এভাবে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে পরিবার জানিয়েছে ভিন্ন কথা। তারা জানান, সেই মুহূর্তের পরিস্থিতি এতটাই আবেগঘন ও শোচনীয় ছিল যে, আনুষ্ঠানিকতা বা অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষা না করে দ্রুত বাড়ি ফেরার জন্য তারা সিএনজিকেই বেছে নিয়েছিলেন।
সাদমানের এই অকাল মৃত্যু দেশে বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবের এক করুণ সংকেত। গত এক মাসে দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ডিএনসিসি হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে বিশেষ ইউনিট চালু করা হয়েছে।
গতকাল বুধবার বিকেলে যখন আজিমপুর গোরস্তানে একমাত্র সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলছিলেন সজীব-মীম দম্পতি, তখন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া সেই ছবিটি হয়ে উঠেছে এক সন্তানহারা পিতার বুকফাটা আর্তনাদ আর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার নীরব সাক্ষী।


