বজ্রপাতে দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন উপজেলায় পাঁচজন, ময়মনসিংহে দুজন, নীলফামারীতে একজন, পঞ্চগড়ে একজন, চুয়াডাঙ্গায় একজন, বগুড়ায় একজন ও শেরপুরে একজন রয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন উপজেলায় বৃষ্টির সময় পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় তিন নারীসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। শিবগঞ্জ উপজেলায় তিন জন, সদর উপজেলায় একজন এবং নাচোল উপজেলায় একজন রয়েছেন। বিকেলের দিকে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
শিবগঞ্জ উপজেলার তিনজন হলেন— চককীর্তি ইউনিয়নের চকনরেন্দ্র গ্রামের আব্দুর রবের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার, রানীবাড়ি-বাজারপাড়ার আবুল কাশেমের মেয়ে সাদিয়া খাতুন এবং মোবারকপুর ইউনিয়নের শিকারপুর দক্ষিণপাড়ার ফিটু আলীর ছেলে মো. মেসবাউল।
শিবগঞ্জ থানার ওসি মতিউর রহমান বলেন, এ তিনজনই বাড়ির পাশের আম বাগানে বৃষ্টির মধ্যে আম কুড়াতে গিয়ে বজ্রপাতের শিকার হন।
অন্য দুটি ঘটনার মধ্যে সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের আতাহার এলাকায় বৃষ্টির সময় মাঠে গরু আনতে গিয়ে বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন মো. রাব্বির ছেলে আব্দুল্লাহ। স্থানীয়রা তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ছাড়াও নাচোল উপজেলার লাহাবাড়ি গ্রামে মাঠে ঘাস কাটতে গিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতে মারা যান সুমিয়ারা বেগম নামের এক নারী।
দুটি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সদর মডেল থানার ওসি একরামুল হোসাইন ও নাচোল থানার ওসি সুকোমল চন্দ্র দেবনাথ।
ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের দুই উপজেলায় বজ্রপাতে এক কলেজশিক্ষকসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গফরগাঁও উপজেলায় সিয়াম (২৮) নামে এক যুবক এবং দুপুর ১টা ১৫ মিনিটের দিকে মুক্তাগাছায় এএসএম খালেকুল আজাদ (৫৬) নামে এক কলেজশিক্ষকের মৃত্যু হয়।
নিহত সিয়াম উপজেলার পাগলা থানার পাঁচভাগ ইউনিয়নের মধ্য লামকাইন গ্রামের মৃত রুকন উদ্দিনের ছেলে এবং শিক্ষক খালেকুল আজাদ উপজেলার বড়গ্রাম ইউনিয়নের রঘুনাথপুর রৌয়ারচর গ্রামের মৃত হাজী ইউসুফ আলীর ছেলে। তিনি মুক্তাগাছা উপজেলার গাবতলী ডিগ্রি কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বাড়ির আঙিনায় ধানের কাজ করছিলেন সিয়াম। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে হোসেনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পাগলা থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে মুক্তাগাছায় বজ্রপাতে এএসএম খালেকুল আজাদ (৫৬) নামে এক কলেজশিক্ষকের মৃত্যু হয়। দুপুর সোয়া ১টার দিকে উপজেলার রঘুনাথপুর রৌয়ারচর বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কলেজ বন্ধ থাকায় নিজ গ্রামে একটি মসজিদের নির্মাণকাজ তদারকি করছিলেন খালেকুল আজাদ। দুপুর ১টা ১৫ মিনিটের দিকে বৃষ্টির সঙ্গে আকস্মিক বজ্রপাত শুরু হলে সেখানে থাকা অন্যরা নিরাপদ স্থানে সরে যান। এ সময় তিনি পাশের একটি আমগাছের নিচে আশ্রয় নেন। হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সায়েম তানভীর বলেন, বজ্রপাতে তিনি আহত হন। হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
নীলফামারী
নীলফামারীর ডিমলায় বজ্রপাতে আলম ইসলাম (৪০) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এ সময় সেরিনা বেগম (৩০) নামের এক গৃহবধূ গুরুতর আহত হয়। সন্ধ্যায় উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের নিজপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
আলম ইসলাম নাউতারা ইউনিয়নের নিজপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলামের ছেলে ও আহত গৃহবধূ সেরিনা একই এলাকার বাসিন্দা।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যায় বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হয়। এ সময় নিজ বাড়ির পাশে আকস্মিক বজ্রপাতের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান আলম ইসলাম। তার পাশে থাকা এক প্রতিবেশী গৃহবধূ গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা আহত তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে যান।
ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদুজ্জামান বলেন, সন্ধ্যার দিকে বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির মরদেহ হাসপাতালে রয়েছে। আহত গৃহবধূকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে চিকিৎসধীন আছেন। তিনি বর্তমানে সুস্থ আছেন।
ডিমলা থানা পুলিশের ওসি শওকত আলী সরকার বলেন, বজ্রপাতে একজন মারা যাওয়ার বিষয়টি জেনেছি।
পঞ্চগড়
পঞ্চগড়ে বজ্রপাতে শাহাদাত হোসেন (১৯) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। বিকেলে সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শাহাদাত ট্রাক্টরের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। বিকেলে তিনি ট্রাক্টরচালকের সঙ্গে ফসলি জমি থেকে ভুট্টা পরিবহন করছিলেন। এ সময় ট্রাক্টরের চাকা নরম মাটিতে দেবে যায়। বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় ট্রাক্টর তোলার কাজে ব্যবহারের জন্য একটি বেলচা আনতে বাড়িতে যান তিনি।
বেলচা নিয়ে ঘটনাস্থলে ফেরার পথে হঠাৎ বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন শাহাদাত। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অমরখানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান নুরু বিষয়টি জানিয়েছেন।
চুয়াডাঙ্গা
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নান্দবার গ্রামে বজ্রপাতে নাফিজ আহমেদ শান্ত (২৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় তার চাচাতো নাহিদ (২৩) গুরুতর আহত হয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বিকেলে নাফিজের বাড়ির ছাদে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত দুজনকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক নাফিজ আহমেদ শান্তকে মৃত ঘোষণা করেন।
নাফিজ আহমেদ শান্ত আলমডাঙ্গা উপজেলার গাংনী ইউনিয়নের নান্দবার গ্রামের জাহাঙ্গীরের ছেলে। আহত নাহিদ একই গ্রামের লিটনের ছেলে। সম্পর্কে তারা দুজন চাচাতো ভাই।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যার আগে থেকেই এলাকায় ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়। এ সময় নাফিজ আহমেদ শান্ত ও তার চাচাতো ভাই নাহিদ, নাফিজের বাড়ির দ্বিতীয় তলার ছাদে বসে ছিলেন। একপর্যায়ে বজ্রপাত হলে ছাদের পাশের একটি নারিকেল গাছে আগুন ধরে যায়। একই সঙ্গে বজ্রপাতের আঘাতে দুই যুবক অচেতন হয়ে পড়েন।
পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং দুজনকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে নাফিজকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত নাহিদকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক রোকাইয়া বলেন, সন্ধ্যা ৭টার দিকে বজ্রপাতে আহত দুজনকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শান্তকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আহত নাহিদকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বগুড়া
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় মরিচ ক্ষেতে কাজ করার সময় বজ্রপাতে রাব্বি হোসেন (১৫) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তার মা মনিকা বেগম গুরুতর আহত হয়েছেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের মাঠে এ ঘটনা ঘটে। নিহত রাব্বি হোসেন ওই গ্রামের আফাল উদ্দিনের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বিকেলে রাব্বি হোসেন তার মা মনিকা বেগমসহ কয়েকজনের সঙ্গে তেঁতুলিয়া গ্রামের মাঠে মরিচ ক্ষেতে কাজ করছিলেন। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে রাব্বি ঘটনাস্থলেই মারা যায়। একই ঘটনায় তার মা গুরুতর আহত হন। পরে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
আদমদীঘি থানার ওসি কামরুজ্জামান মিয়া বজ্রপাতে রাব্বি হোসেন বলেন, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
শেরপুর
শেরপুরে বজ্রপাতে মো. মিজান মিয়া (২১) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। বিকেলে সদর উপজেলার চরপক্ষীমারি ইউনিয়নের সাতপাকিয়া মধ্যপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত মিজান মিয়া ওই এলাকার কমল মিয়ার ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে মিজান তার বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলতে যান। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে জামালপুর জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
শেরপুর সদর থানার ওসি মো. সোহেল রানা বলেন, আবেদনের ভিত্তিতে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন