× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২২, ২০২৫, ০৮:৪১ পিএম

বন্দর চুক্তি : খুলে যাক বন্ধ দুয়ার

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২২, ২০২৫, ০৮:৪১ পিএম

সমুদ্রবন্দর। ছবি- সংগৃহীত

সমুদ্রবন্দর। ছবি- সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সমুদ্রবন্দর সবসময়ই কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ এই বন্দরনির্ভর হওয়ায় বন্দর ব্যবস্থাপনার দক্ষতা সরাসরি জাতীয় প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে একটি ড্যানিশ আন্তর্জাতিক বন্দর ব্যবস্থাপনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন দুয়ার খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলে আমি মনে করি। এই সম্ভাবনাকে আমি কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে চাই।

প্রথমত, অর্থনৈতিক দিক থেকে এই চুক্তির প্রভাব হবে বহুমাত্রিক। আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় ড্যানিশ কোম্পানির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা পণ্য পরিবহনের খরচ কমাবে। সময় সাশ্রয় করবে। এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও গতিশীল করবে। কন্টেইনার জাহাজের পরিবর্তন জনিত সময় কমার ফলে রপ্তানিকারকরা খুব দ্রুত পণ্য পাঠাতে পারবেন। আমদানিকারকদের গুদামজাত ব্যয়ও হ্রাস পাবে। এর ফলে শিল্পখাতে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে।

দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই চুক্তি একটি বড় সুযোগ কিস্তি করবে বলে আমি মনে করি। আধুনিক বন্দর মানেই কেবল যন্ত্রপাতি নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ। অপারেশন, লজিস্টিকস, আইটি, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি হবে। স্থানীয় শ্রমশক্তি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ পেলে তাদের দক্ষতা বাড়বে, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য খাতেও কাজে লাগবে। প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবহন, গুদামজাতকরণ, বিমা ও সহায়ক সেবাখাতেও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তির ব্যবহার এই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। আধুনিক টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় কন্টেইনার হ্যান্ডলিং, ডিজিটাল কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং। এসব প্রযুক্তি বন্দরের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াবে। কাগজপত্রের জটিলতা কমে এলে হয়রানি ও অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমবে। ব্যবসায়ীরা সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় করতে পারবেন, যা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে এই চুক্তির প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীরা অবকাঠামো ও লজিস্টিক সক্ষমতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। একটি দক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বন্দর থাকলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে বিবেচনা করতে আগ্রহী হবে। ফলে উৎপাদন, রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ট্রান্সশিপমেন্টে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে বন্দরের অবস্থান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে বন্দরের দক্ষতা ও লজিস্টিক পারফরম্যান্স বিবেচিত হয়। আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির ফলে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর র‍্যাংকিং উন্নত হলে দেশের সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। এর প্রভাব পড়বে রপ্তানি আদেশ বৃদ্ধি, ঋণপ্রাপ্তি সহজীকরণ এবং বৈশ্বিক বাজারে আস্থার প্রসারে।

এই ইতিবাচক সম্ভাবনার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধানের সুযোগ। বাংলাদেশের বন্দর খাত দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অব্যবস্থাপনা ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে জর্জরিত। আন্তর্জাতিক মানের অপারেটরের অংশগ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া চালু হলে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত কমবে। ফলে অনিয়মের সুযোগ সংকুচিত হবে। চাঁদাবাজি ও অবৈধ সুবিধা আদায়ের সংস্কৃতি ভাংতে এটি একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।

পাশাপাশি আমি এ কথা বলতে চাই যে, জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ, চুক্তির শর্তাবলি, স্থানীয় অংশীদারিত্ব ও শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন। স্বচ্ছ চুক্তি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও নিয়মিত নজরদারি ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিই টেকসই হয় না। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে এটা নিশ্চিত করা যে, এই চুক্তির মাধ্যমে কৌশলগত সম্পদের ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে এবং লাভের ন্যায্য অংশ পাবে দেশের জনগণ।

শেষ কথা: সামগ্রিক বিচারে, ড্যানিশ কোম্পানির সঙ্গে বন্দর চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ। সব ক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার বাস্তব সুযোগ রয়েছে বলে আমি মনে করি। একই সঙ্গে এটি দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার সংস্কৃতি ভাঙার একটি জানালা খুলে দিতে পারে।

সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলে এই চুক্তি সত্যিই ‘বন্ধ দুয়ার’ খুলে দিতে সক্ষম হবে, যার সুফল ভোগ করবে বাংলাদেশের মানুষ।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা

Link copied!