× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রিয়াজুল হক

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৫, ২০২৫, ০৮:৫৭ পিএম

ডিজিটাল শ্রম : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নীরব সৈনিক

রিয়াজুল হক

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৫, ২০২৫, ০৮:৫৭ পিএম

রিয়াজুল হক। ছবি: সংগৃহীত

রিয়াজুল হক। ছবি: সংগৃহীত

একসময় শ্রম বলতে বোঝানো হতো মাঠে-ঘাটে, কলকারখানায় কাজ করা। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তির বিকাশ শ্রমের সেই চিরাচরিত সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে। আজকের পৃথিবীতে শ্রম মানেই শুধু ঘাম ঝরানো শারীরিক পরিশ্রম নয়। বরং কম্পিউটারের পর্দার সামনে বসে মেধা, দক্ষতা ও সময় বিনিয়োগ করাও এক ধরনের শ্রম, যাকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল শ্রম। এই ডিজিটাল শ্রমের বড় একটি অংশজুড়ে আছে ফ্রিল্যান্সিং, যেখানে বাংলাদেশ আজ বিশ্বমানচিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য নাম।

গত এক দশকে বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কনটেন্ট রাইটিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ভিডিও এডিটিং, সফটওয়্যার টেস্টিং ইত্যাদি অসংখ্য খাতে তরুণরা যুক্ত হচ্ছেন বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে।

এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ স্পষ্ট। প্রথমত, ইন্টারনেটের বিস্তৃতি ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা। দ্বিতীয়ত, দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, যাদের বড় একটি অংশ কর্মসংস্থানের প্রচলিত সুযোগের বাইরে। তৃতীয়ত, তুলনামূলক কম পুঁজি দিয়ে কাজ শুরু করার সুযোগ আর চতুর্থত, বৈশ্বিক আউটসোর্সিং বাজারে বাংলাদেশি শ্রমের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য।

ডিজিটাল শ্রমের সবচেয়ে বড় অবদান হলো বৈদেশিক মুদ্রা আয়। ফ্রিল্যান্সাররা সরাসরি বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে ডলার, ইউরো বা পাউন্ডে পারিশ্রমিক পান, যা দেশের রিজার্ভে যুক্ত হয়। প্রবাসী আয় বা রপ্তানি খাতের বাইরে এটি এক ধরনের ‘অদৃশ্য রপ্তানি’, যেখানে কোনো পণ্য পাঠাতে হয় না, বন্দরে জট লাগে না, কাস্টমসের ঝামেলাও নেই।

একজন সফল ফ্রিল্যান্সার মাসে কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার ডলার আয় করতে পারেন। এই আয় শুধু ব্যক্তিগত জীবনমান বদলায় না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি আনে। বাসা ভাড়া, ভোগ্যপণ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য‌ ইত্যাদি সব খাতে এই অর্থ ব্যয় হয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায়। ফলে ডিজিটাল শ্রম অর্থনীতিতে এক ধরনের বহুমুখী প্রভাব তৈরি করছে।

বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘শিক্ষিত বেকারত্ব’। প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে বের হলেও সবার জন্য সরকারি বা বেসরকারি চাকরি নেই। এই প্রেক্ষাপটে ফ্রিল্যান্সিং একটি বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে আশার আলো দেখিয়েছে।

বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বলের তরুণদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানীকেন্দ্রিক চাকরির চাপ কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আয় করার সুযোগ তৈরি করছে ডিজিটাল শ্রম। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একজন তরুণ নিজে ফ্রিল্যান্সিং করে শুধু নিজের নয়, পরিবারের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি ঘটাচ্ছেন। এমনকি অন্যের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করছেন।

ডিজিটাল শ্রম সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। ‘চাকরি মানে অফিসে যাওয়া’—এই ধারণা ভেঙে নতুন এক কাজের সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, যেখানে দক্ষতাই মুখ্য, অবস্থান নয়।

এই উজ্জ্বল চিত্রের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়।

প্রথমত: দক্ষতার ঘাটতি—অনেকেই প্রশিক্ষণ ছাড়া ফ্রিল্যান্সিংয়ে নামছেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত: পেমেন্ট গেটওয়ে ও বৈদেশিক লেনদেনের জটিলতা—সময়মতো অর্থ না পাওয়া বা অতিরিক্ত চার্জ কেটে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তৃতীয়ত: সামাজিক নিরাপত্তার অভাব—একজন ফ্রিল্যান্সারের নির্দিষ্ট চাকরি নেই, নেই স্বাস্থ্য বিমা, নেই অবসর ভাতা। কাজ না থাকলে আয়ও নেই। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি অনিশ্চিত পেশা হয়ে উঠতে পারে।

চতুর্থত: মানসিক চাপ ও কাজের অনিশ্চয়তা—যা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।

ডিজিটাল শ্রমকে টেকসই অর্থনৈতিক খাতে রূপ দিতে হলে নীতিগত সহায়তা জরুরি। সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রকল্প ও আইটি পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

  • প্রথমত: মানসম্মত ও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ।
  • দ্বিতীয়ত: ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সহজ ও স্বচ্ছ পেমেন্ট ব্যবস্থা।
  • তৃতীয়ত: করনীতি ও প্রণোদনা, যাতে বৈধ পথে আয় দেশে আনার আগ্রহ বাড়ে।
  • চতুর্থত: সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে ফ্রিল্যান্সারদের অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তা।

ডিজিটাল শ্রম কোনো সাময়িক ট্রেন্ড নয়, এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ যদি তার তরুণ জনশক্তিকে দক্ষ ডিজিটাল শ্রমে রূপান্তর করতে পারে তবে এটি শুধু বেকারত্ব কমাবে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।

ফ্রিল্যান্সাররা আজ আর শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নন, তারা দেশের অর্থনীতির নীরব সৈনিক। এই নীরব সৈনিকদের সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়া, সুরক্ষা দেওয়া এবং যথাযথ নীতির মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে আগামীর বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন কৌশল।

লেখক: রিয়াজুল হক, অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!