বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভুবন বহু উত্থান-পতনের আলো-অন্ধকারে দগ্ধ হয়েছে, কিন্তু এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো ব্যক্তিগত স্মৃতির মণিকোষে দীপশিখার মতো জ্বলে থাকে। সেইসব মুহূর্তেই কোনো নেতার অবয়ব শুধু ব্যক্তিত্ব নয়, এক ধরনের পৌরাণিক ও নন্দিত মহিমায় আলোকিত হয়ে ওঠে। বেগম খালেদা জিয়াকে প্রথম দেখার আমার দিনটি তেমনই একটি দিন, একটি শৈশব-জাগ্রত বিস্ময়ের অপরূপ সকাল, যার আলো এখনো নিভে যায়নি।
খালেদা জিয়ার প্রতি আমার প্রথম মুগ্ধতা ছড়ায় ১৯৯৫ সালের ৫ এপ্রিল। ওই বছর তাকে সামনা-সামনি দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। খালেদা জিয়া আমাদের উপজেলার সখিপুর থানায় আসবেন। এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে টানা মাইকিং চলছে। আমাদের এলাকা আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এখানে কোনো বিএনপি নেতা সুবিধা করতে পারে না। একটি পরিবার বিএনপির সঙ্গে যুক্ত কিন্তু, ঘরের কাছে আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি-সেক্রেটারির বাড়ি হওয়ায় কখনই সুবিধা করতে পারেনি তারা। আমাদের আসনের বিএনপির প্রার্থী শফিকুর রহমান কিরণ। তার বাড়ি সখিপুর। তাই তিনিই বেগম জিয়াকে ওইখানে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। খালেদা জিয়া আসবেন। তাও আমাদের উপজেলায়। আমাদের এলাকায় বিএনপিপন্থি সবার মধ্যেই কেমন যেন একটা উত্তেজনা কাজ করছে। এ উত্তেজনা ভর করল আমার উপরও। আমারও ইচ্ছা হলো সখিপুরে যাওয়ার। স্বচক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রীকে বেগম জিয়াকে দেখার।
আব্বাকে বললাম, আমি খালেদা জিয়াকে দেখতে যাব। তিনি আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, এতদূরের পথ সবাই পায়ে হেঁটে মিছিল নিয়ে যাবে। তুই হেঁটে যেতে পারবি না!
কিন্তু আমার মন আব্বার নিষেধ মানতে চাইছে না। আমি কেমন যেন সাহসী হয়ে উঠলাম। দেশের প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখতেই হবে। নির্দিষ্ট দিনে আমাদের বাড়ির পাশ থেকেই সবাই যাত্রা শুরু করল সখিপুরের উদ্দেশে। দেশের পাওয়াফুল লেডি, আপসহীন নেত্রীকে দেখতে যাওয়ার সেই দলের আমিও একজন, তবে সর্ব কনিষ্ঠ।
আব্বা এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি হওয়ায় আমাকে একটু এক্সট্রা খাতির করা হয়েছে। প্রথমে তো আমাকে নিতেই চায়নি। যাওয়ার পথে বেশ কয়েকবার বড়দের কাঁধে চড়েছি এবং কলা-রুটি পেয়েছি।
আমরা সখিপুর মাঠে পৌঁছানোর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মঞ্চে উঠলেন বেগম জিয়া। আমার থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে। বেগম জিয়া মঞ্চে উঠতেই মুগ্ধতা ছড়াতে থাকল চারপাশে। সেদিন তাকে দেখে, তার কথা শুনে মুগ্ধতায় ভেসে গিয়েছিলাম। ওইদিনের পর থেকেই তার প্রতি ভালোলাগা। আজও বিদ্যমান।
সে বয়সে রাজনীতির রেখাঙ্কন আমার মনে স্পষ্ট ছিল না, কিন্তু একজন নেত্রীর উপস্থিতিতে জনতার ঢেউ দেখে হৃদয়ের ভেতর যে আলোড়ন উঠেছিল, তা ছিল একেবারেই অরাজনৈতিক, শুদ্ধ বিস্ময়, অচেনা আবেগের তীর-তরঙ্গ। আব্বার বাধা সত্ত্বেও আমি সেদিনের মিছিলে পা বাড়াই। গিয়ে দেখি আব্বাও সেখানে উপস্থিত। বাপ-বেটা একসঙ্গে বাড়ি ফিরেছিলাম সেদিন। সব মিলিয়ে দিনটি শৈশবের গায়ে লেপ্টে থাকা বিস্ময়ের গল্পের মতোই ছিল দিনটি।
দুই.
২০১৪ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অন্ধকার বিমূঢ়তার সময়। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে ক্ষমতার লাগাম শক্ত করে ধরালো শেখ হাসিনা। নির্বাচন হয়ে উঠল একতরফা ব্যবস্থার প্রতীক। এই অস্থিরতার মধ্যে যখন বিএনপি ‘মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’ ঘোষণা করল, তখন দেশে নেমে এলো ভয়াবহ ক্র্যাকডাউন।
ঘোর আওয়ামীকালে আরও একবার বেগম জিয়া আরও একবার মুগ্ধতার জোয়ারে ভাসিয়ে দিলেন আমাকে।
সেই সময়ের একটি দৃশ্য আজও আমার মানসপটে যেন জীবন্ত পিঁপড়ের মতো হাঁটাহাঁটি করে। গুলশানের বাসভবন থেকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করতে বের হতে চান বেগম জিয়া। শান্ত কিন্তু দৃঢ় হাতে তিনি ধারণ করেন, বাংলাদেশের পতাকা। চারদিকে সরকারি বাহিনীর অবরোধ, এবং চোখের সামনে লাইভ টেলিভিশনে পুরো জাতি দেখছে এক মহীয়সীর ধীর, ভীতিহীন অগ্রযাত্রা।
এমন দৃশ্য একজন রাজনৈতিক নেতার সাধারণ সাহস নয়, এটি এক অবিচল চরিত্রের প্রকাশ। ১৯৮৬ সালের গৃহবন্দি খালেদা জিয়াকে আমরা অনেকেই দেখিনি, কিন্তু সেই ২০১৪-এর ভোরে আমরা দেখেছিলাম তারই আরেক সংস্করণÑ অদম্য, অভিমানী, অথচ কি নির্মল এক নারী।
তিন.
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরেকটি বিষয় দীর্ঘদিন নিরবচ্ছিন্ন থেকেছে, তাকে নিয়ে শেখ হাসিনার অবমাননাকর ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন কটূক্তির প্রবল বন্যা। অথচ বেগম জিয়া কখনোই এই কাদামাটির রাজনীতিতে গড়াগড়ি খাননি। যেমনটা দেখা গেছে শেখ হাসনিার বেলায়।
শেখ হাসিনা যেখানে ‘আমার বাবার দেশ বাবা, আমার বাবার দেশ’ বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলত! স্বজন হারানোর বেদনার বলার সময় তার মুখে আলাদা একটা জেল্লা চলে আসত, সেখানে বেগম জিয়ার মুখে এযাবৎকালে ‘আমার স্বামীর দেশ, আমার স্বামীর দেশ’ শুনি নাই। ‘স্বজন হারানো বেদনা’ বেগম জিয়ারও ছিল, কিন্তু রাজনীতির মঞ্চে এটাকে ক্যাশ ইন করে তাকে কখনো নগ্ন পলিটিক্যাল বিজনেস করতে দেখি নাই।
বেগম জিয়া এমন এক নেত্রী যিনি, কোনো ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে রাজনৈতিক মঞ্চের হাতিয়ার করেননি।
শেখ হাসিনা যেখানে বারবার তাকে শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে হেয় করেছে, চরিত্রের ওপর কালিমা লেপন করেছে এমনকি তিনি যখন লিভারের অসুখে আক্রান্ত হন, তখন শেখ হাসিনা বলেছে, ‘কি খেলে লিবার নষ্ট হয় আমরা জানি’ এ ছাড়াও পারিবারিক আক্রমণ, ব্যক্তিগত আক্রমণ তো ছিলই। কিন্তু বেগম জিয়া, হাসিনার পরিবার কিংবা ব্যক্তি হাসিনাকে নিয়ে কোনো কটূক্তি করেননি।
যে দেশে পরিবারের শোকগাথা, রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত করা হয়, নিজের পালিত চোর-বাটপারদের দুর্নীতির কথা জানতে চাইলে হাসি দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়, সেখানে বেগম জিয়ার এই নীরবতা, সহনশীলতা তাকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায়।
চার.
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুধু দেশীয় নয়, বিদেশনীতি নিয়েও তার অবস্থান ছিল দৃঢ়, স্বতন্ত্র এবং কখনো কখনো প্রতিকূলতার মধ্যেও সিংহসম সাহসের।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক দ্বিধাহীন; তবে নিজের আত্মসম্মান ও, রাষ্ট্রসম্মানকে সবার উপরে রেখে। চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক, পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য, সার্ককে শক্তিশালী করার অদেখা পরিশ্রম, এসবই প্রমাণ করে, তার রাজনীতি অঞ্চলভিত্তিক ভারসাম্যের অনন্য দৃষ্টান্ত।
কথিত আছে, ইরাক যুদ্ধের সময় মুসলিম সৈন্য পাঠানোর অনুরোধ তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এ দৃঢ়তা ছিল স্বাধীন দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত।
পাঁচ.
১৯৯১ সালে সুপার সাইক্লোনে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরাট বিপর্যয়। সদ্য নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কাঁধে দায়িত্ব পাহাড়সম, তবু দৃঢ় হাতে তিনি সামলালেন সংকট, নিয়ে এলেন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ‘অপারেশন সি এঞ্জেল’।
২০০৪-২০০৫ সময়কালের জেএমবি সন্ত্রাস, এটিকেও তিনি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণে আনেন। তার শাসনকে ঘিরে বহু বিতর্ক থাকলেও, সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে তার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।
ছয়.
ওয়ান-ইলেভেনের প্রলয়ংকরী ঝড় যখন রাজনীতিকে গ্রাস করছিল, তখন দুদিক থেকে প্রবল চাপ ছিল দেশের দুই প্রধান দলের ওপর। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেলেন, আর বেগম জিয়া আতঙ্ক, ভয়, অস্ত্রভীতির মাঝেও নিজের মাটি ছাড়েননি। এই দৃঢ়তা এক নেত্রীর চরিত্রকে ইতিহাসে অক্ষয় করে দেয়।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। একসময় গৃহিণী থেকে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উঠে আসা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দৌড় ছিল সংগ্রাম, সাফল্য ও বিতর্কে সমৃদ্ধ। তিনি গণতন্ত্র রক্ষায় কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়েছেন।
খালেদা জিয়ার ইন্তেকাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করল। দীর্ঘ সংগ্রাম, আপসহীন নেতৃত্ব ও অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা তার জীবন ছিল সময়ের সাক্ষ্য। ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক, তিনি ছিলেন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। সমর্থক ও সমালোচক উভয়ের কাছেই আলোচনার বিষয়। তার প্রস্থান জাতিকে শোকাহত করেছে। ‘দেশনেত্রী’ খালেদা জিয়া নেই, কিন্তু তার রাজনৈতিক ভূমিকা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তার প্রভাব ইতিহাসে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
হে মহীয়সী,
আপনার শান্ত- দৃঢ়তা, আপনার মিতবাক অথচ মহিমান্বিত নেতৃত্ব, সব সময় দেশের গণতন্ত্রের আকাশে দিশারীর মতো জ্বলবে। কারণ কোনো কোনো নেতৃত্ব ইতিহাসের সম্পত্তি হয়ে যায়। আপনি বাংলাদেশের তেমনই এক নেতৃত্ব। আপনার প্রয়োজন এই দেশ অনুভব করবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম।
লেখক: সাংবাদিক ও গীতিকবি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন