× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রায়হানুল ইসলাম

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ০৮:১৬ পিএম

মিয়ানমার সীমান্তে মাদকের স্রোত : জাতীয় নিরাপত্তার নীরব হুমকি

রায়হানুল ইসলাম

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ০৮:১৬ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত আজ শুধু একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, বরং এটি ক্রমেই একটি ভয়ংকর অপরাধ-প্রবাহের করিডরে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমার থেকে আসা মাদকের স্রোত, এর সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশের জড়িয়ে পড়া এবং আরাকান আর্মির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, আবার বিষয়টিকে অতিসরলীকরণ বা আবেগ দিয়ে দেখাও হবে আত্মঘাতী ভুল।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য বহু বছর ধরেই ইয়াবা ও অন্যান্য সিনথেটিক মাদকের অন্যতম উৎপাদন ও ট্রানজিট এলাকা হিসেবে পরিচিত। দেশটির রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ, কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য মাদক কারবারকে সহজ করেছে। বিশেষ করে আরাকান আর্মি বর্তমানে রাখাইনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করায় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো কার্যত একটি ‘গ্রে জোনে’ পরিণত হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন কার্যকর করা কঠিন। অভিযোগ রয়েছে, এই সশস্ত্র গোষ্ঠী সরাসরি বা চাঁদা ও নিরাপত্তা দেওয়ার মাধ্যমে মাদক পরিবহনকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, যা তাদের অর্থের বড় উৎসে পরিণত হয়েছে।

এই মাদক স্রোত বাংলাদেশে ঢোকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ হচ্ছে টেকনাফ-নাফ নদী সীমান্ত ও পার্বত্য দুর্গম অঞ্চল। এখানেই রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোর অবস্থান। প্রায় এক দশক ধরে সীমিত সুযোগ-সুবিধা, কর্মসংস্থানের অভাব, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার স্থবিরতা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখানে স্পষ্ট করে বলা দরকার—সব রোহিঙ্গা মাদক কারবারে জড়িত নয়। বরং একটি ছোট কিন্তু সক্রিয় চক্র এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। তবুও এই অংশগ্রহণ পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে শরণার্থীদের সম্পর্ক আরও জটিল করে তুলছে।

মাদক কারবারের কাঠামোটি বেশ সুসংগঠিত। মিয়ানমারে উৎপাদিত ইয়াবা প্রথমে সীমান্তের ওপারে গুদামজাত হয়, সেখান থেকে নদীপথ, পাহাড়ি ট্রেইল বা জেলেদের নৌকা ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। স্থানীয় দালাল, সীমান্ত এলাকার কিছু অসাধু ব্যক্তি এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সংযোগে এটি দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরাপত্তা দেওয়া, রোহিঙ্গা তরুণদের বাহক হিসেবে ব্যবহার এবং প্রযুক্তি-নির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যবহার মাদক দমনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

এর ফলাফল ভয়াবহ। ইয়াবাসহ মাদকের সহজলভ্যতায় তরুণ সমাজের একটি অংশ ধ্বংসের পথে যাচ্ছে, অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হচ্ছে এবং সীমান্ত এলাকায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। শুধু সামাজিক ক্ষতি নয়, এই মাদক অর্থনীতির সঙ্গে অস্ত্র পাচার, মানব পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

এই সংকট মোকাবিলায় প্রথম ও প্রধান প্রয়োজন সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সীমান্ত নজরদারি, নৌ ও স্থল টহল বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকর সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, কারণ সীমান্তে সামান্য দুর্বলতাই পুরো ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বিকল্প জীবিকায়ন, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, যাতে তরুণরা অপরাধী চক্রের ফাঁদে না পড়ে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া নিরাপত্তাভিত্তিক সমাধান টেকসই হবে না।

তৃতীয়ত, কূটনৈতিক পর্যায়ে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে তারা সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক উৎপাদন ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। আঞ্চলিক সহযোগিতা, বিশেষ করে আসিয়ান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ততা ছাড়া এই সমস্যার শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। পাশাপাশি দেশের ভেতরে মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে, কারণ চাহিদা না কমলে সরবরাহ বন্ধ করা কঠিন।

সবশেষে বলা যায়, মিয়ানমার থেকে আসা মাদক, রোহিঙ্গা সংকট এবং আরাকান আর্মির সম্পৃক্ততা—এই তিনটি বিষয় আলাদা নয়, বরং একটি জটিল নিরাপত্তা ও মানবিক চ্যালেঞ্জের ভিন্ন ভিন্ন দিক। একে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না, আবার মানবিকতার দোহাই দিয়ে অপরাধ উপেক্ষাও করা যাবে না। প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ, দূরদর্শী ও বহুমাত্রিক কৌশল, যাতে সীমান্ত সুরক্ষা, মানবিক দায়িত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ—তিনটিই সমান গুরুত্ব পায়।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Link copied!