২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নয়, বরং অর্থনৈতিক মুক্তির এক নতুন আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। গত দেড় দশকের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার শিল্পায়ন ও আর্থিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
এই সংস্কারের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) কর্তৃক বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবহৃত জমিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের সাহসী উদ্যোগ। বিশেষ করে ডেমরার করিম জুট মিলসকে অত্যাধুনিক শিল্প জোনে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিগত সরকারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বর্তমান সরকার বাস্তবমুখী ও ফলপ্রসূ কৌশল গ্রহণ করেছে। বেজার বর্তমান নীতি হলো উচ্চ সম্ভাবনাপূর্ণ ও দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য ১০টি জোনের ওপর গুরুত্বারোপ। করিম জুট মিলস সেই ১০টি অগ্রাধিকারভিত্তিক জোনের অন্যতম। প্রায় ৪৯.৬৩ একর জমির এই মিলটি দীর্ঘদিন কোনো কার্যকর অর্থনৈতিক কাজে ব্যবহৃত হয়নি। বেজার সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই জমি শিল্পায়নের পাশাপাশি ঢাকার কাছে একটি শক্তিশালী লজিস্টিক হাব গড়ে তুলতে সক্ষম।
করিম জুট মিলসের ভৌগোলিক অবস্থান এটিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত মিলটির নিজস্ব জেটি সুবিধা পণ্য পরিবহনে নৌপথ ব্যবহারের সুযোগ প্রসারিত করেছে। সড়কপথে সুলতানা কামাল সেতুর মাধ্যমে এটি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের সাথে সংযুক্ত। বিদ্যমান ইউটিলিটি সুবিধা, যেমন ১২৫০ কেভিএ ও ১৩৫০ কেভিএ ক্ষমতার বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন এবং ৮৫,০০০ কিউবিক মিটার ক্ষমতা সম্পন্ন গ্যাস সংযোগ, বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রাথমিক পুঁজির চাপ কমিয়ে দিচ্ছে। ৩৬,১৩৬ বর্গমিটার স্থাপনাগুলোকে সংস্কারের মাধ্যমে সরাসরি কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। আনুমানিক ২০০-৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে বছরে ১৮.৫২ কোটি টাকা আয় প্রবাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
রূপান্তর প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বেজার প্রাক্কলন অনুযায়ী, এখানে প্রত্যক্ষভাবে ২৫,০০০ এবং পরোক্ষভাবে আরও ৪০,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান হবে, যার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বা ১৭,৫০০ জন নারী শ্রমিক। তৈরি পোশাক শিল্প, ইলেকট্রনিক এসেম্বলিং এবং পশ্চাৎ সংযোগ শিল্পের প্রসারের মাধ্যমে এই জোনের রপ্তানি সক্ষমতা ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। এটি জিডিপি বৃদ্ধির পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের শিল্পনীতির বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি শাসনামলই নিজস্ব অর্থনৈতিক দর্শন অনুযায়ী কাজ করেছে। স্বাধীনতার পর সমাজতান্ত্রিক দর্শনে ৩৫০টিরও বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়। পরবর্তীতে বেসরকারি শিল্পায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির সূচনা, বেপজা এবং 'দেশ গার্মেন্টস'-এর মাধ্যমে পোশাক শিল্পের ভিত্তি স্থাপন এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্পায়নকে আরও প্রগতিশীল রূপ দেওয়া হয়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই ধারাবাহিকতাকে আরও শক্তিশালী করে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সংস্কারে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর 'জুলাই সনদ' স্বাক্ষরিত হয়। ২৪টি রাজনৈতিক দলের ঐক্যমত্যে এই সনদ নিশ্চিত করেছে যে ভবিষ্যৎ সরকার ডক্টর ইউনূসের সরকারের শিল্প নীতি ও সংস্কার কর্মসূচি মেনে চলবে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা ১০ বছর, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের প্রস্তাব বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করেছে।
করিম জুট মিলসের মতো প্রকল্প কেবল একটি কারখানা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের একটি মডেল। কুষ্টিয়া সুগার মিলস ও মোহিনী টেক্সটাইল মিলের রূপান্তরও কৃষিভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক শিল্পাঞ্চলে পরিণত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ১৫ মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বৈদেশিক বিনিয়োগে ১৯.১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা বিপ্লব পরবর্তী অর্থনীতির দ্রুত পুনরুদ্ধারের প্রমাণ। করিম জুট মিলসের রূপান্তর কেবল শিল্পায়নের সাফল্য নয়, এটি লাখো পরিবারের নতুন জীবন ও বাংলাদেশের 'নতুন শিল্প বিপ্লবের' প্রতীক। সরকারের এই সংস্কারমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী শিল্প রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
সর্বশেষ, পাটকল চালু রাখার পাশাপাশি পাটের উৎপাদন ও বিপনন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের এই পদক্ষেপ সমগ্র শিল্পচক্রকে শক্তিশালী করবে এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন