× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম

রোহিঙ্গা সংকটের আশু সমাধান চাই

আহসান হাবিব

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

মানবসভ্যতার ইতিহাসে শরণার্থী সংকট নতুন নয়। কিন্তু কিছু সংকট কেবল পরিসংখ্যান নয় বরং তা হয়ে ওঠে মানবতার পরীক্ষাক্ষেত্র। রোহিঙ্গা সংকট তেমনই এক নির্মম বাস্তবতা, যা শুধু একটি জনগোষ্ঠীর দুর্দশার গল্প নয়; এটি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মানবিক দায়িত্ববোধের এক জটিল সমীকরণ।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের পর লাখো রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ইতোমধ্যে কয়েক দফা সহিংসতা ও বৈষম্যের ইতিহাস বহনকারী এই জনগোষ্ঠীর জন্য সেটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার শেষ আশ্রয়।

বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় তাদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়। আজ কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী শিবির গড়ে উঠেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই পরিস্থিতি আর কতদিন চলবে?

বাংলাদেশ শুরু থেকেই স্পষ্ট করেছে—রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া মানবিক দায়িত্ব, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নয়। কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে, তবু নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি নেই। ফলে এই সংকট এখন মানবিকতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে চাপ বহন করছে—পরিবেশের ক্ষয়, শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক টানাপোড়েন। আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণও ক্রমশ কমছে।

জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় শিবিরে অপুষ্টি ও হতাশা বাড়ছে। তরুণদের সামনে কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় অপরাধচক্র ও উগ্রপন্থার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এটি কেবল একটি মানবিক শিবিরের সমস্যা নয়; এটি একটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার পূর্বাভাস।

রোহিঙ্গা সংকটের মূলে রয়েছে নাগরিকত্বের প্রশ্ন। মিয়ানমার সরকার তাদের জাতিগত স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য চালিয়ে এসেছে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন কার্যত রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন করে তোলে। নাগরিকত্ব ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চলাচল—সব মৌলিক অধিকারই হয়ে পড়ে অনিশ্চিত।

অতএব, প্রত্যাবাসনের আলোচনায় শুধু প্রত্যাবর্তনের তারিখ নয়; নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করাই হতে হবে মূল এজেন্ডা। অন্যথায় তা হবে পুনরায় নিপীড়নের ফাঁদে ঠেলে দেওয়া।

রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। জাতিসংঘ বিভিন্ন ফোরামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উত্থাপন করে। International Court of Justice–এ গণহত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আন্তর্জাতিক নিন্দা ও প্রস্তাবের পরও কার্যকর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে দৃশ্যমান সাফল্য খুবই সীমিত।

ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে সমাধান বারবার বিলম্বিত হচ্ছে। এখানে বিশ্বশক্তিগুলোর দ্বৈত মানদণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ। ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থী সংকট দ্রুত বৈশ্বিক অগ্রাধিকারে পরিণত হলেও দক্ষিণ এশিয়ার এই সংকট ক্রমে “দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সমস্যা” হিসেবে উপেক্ষিত হয়ে পড়ছে। যা মোটেও কাম্য হতে পারে না।

বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগ নিয়েছে। চীন, ভারত ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যস্থতায় আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে অনিচ্ছুক।

এক্ষেত্রে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থেই মিয়ানমারে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমাধান দরকার। অন্যথায় সীমান্তপারের অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকবে। এতে কোন সন্দেহ নেই।

দীর্ঘদিন শিবিরে অবস্থানরত জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশা, বেকারত্ব ও অপরাধপ্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ইতোমধ্যে শিবিরে অস্ত্র ও মাদক চক্রের সক্রিয়তার খবর পাওয়া গেছে। এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের বিষয়। তাই একদিকে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে, অন্যদিকে শৃঙ্খলা ও আইন-শৃঙ্খলা জোরদার করতে হবে। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলে তরুণদের বিকল্প পথ দেখানো সম্ভব।

রোহিঙ্গা সংকটের আশু ও টেকসই সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয়ে জোর দেওয়া জরুরি—

১. নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন: আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া পরিচালনা।

২. নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিতকরণ: মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন সংস্কার ও জাতিগত স্বীকৃতি প্রদান।

৩. আন্তর্জাতিক চাপ ও জবাবদিহিতা: মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় নিরূপণ ও দোষীদের বিচারের আওতায় আনা।

৪. আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি: শিবির পরিচালনা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন সহায়তা নিশ্চিত করা।

৫. আঞ্চলিক কূটনৈতিক জোট গঠন: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ।

বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল একটি পররাষ্ট্র নীতির বিষয় নয়; এটি নৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন। দীর্ঘমেয়াদি বোঝা বহন করা কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই সহজ নয়। তবু মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সংহতি।

রোহিঙ্গারা কোনো পরিসংখ্যান নয়; তারা মানুষ—যাদের আছে স্বপ্ন, স্মৃতি, পরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা। একটি শিশু শরণার্থী শিবিরে জন্ম নিয়ে বড় হচ্ছে—নিজ মাতৃভূমি না দেখেই। এই প্রজন্ম যদি রাষ্ট্রহীনতার উত্তরাধিকার বহন করে, তবে তা হবে মানবসভ্যতার ব্যর্থতা।

রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই তা জটিল ও ব্যয়বহুল হবে-বাংলাদেশের জন্য, অঞ্চলের জন্য, বিশ্বের জন্য। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিণতি আছে, এবং রাষ্ট্রহীনতার অবসান ঘটাতে হবে। একইসঙ্গে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। তবে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে নতুন সরকারকেই।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

 

Link copied!