বাংলাদেশের অর্থনৈতিক জীবনীশক্তি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান তোরণ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা একে জাতীয় অর্থনীতির ‘হৃৎপিণ্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে রিয়ার অ্যাডমিরাল এস.এম. মনিরুজ্জামান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার দায়িত্ব গ্রহণের পরবর্তী ১৫ মাসে বন্দর ব্যবস্থাপনায় যে আমূল পরিবর্তন ও অভাবনীয় সাফল্য পরিলক্ষিত হয়েছে, তা কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।
বিশেষ করে ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকার রেকর্ড আয় এবং ৩ হাজার ১৪২ কোটি টাকার নিট উদ্বৃত্ত অর্জন বন্দরের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে এই দৃশ্যমান সফলতার সমান্তরালে একটি বিশেষ মহলের পক্ষ থেকে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে নানাবিধ ষড়যন্ত্র এবং অপপ্রচার দানা বেঁধেছে, যা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আয় ৫ হাজার ৪৬০.১৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা একটি নতুন রেকর্ড। বর্তমান প্রশাসনের ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৭.৫৯ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়েছে, যার ফলে নিট উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩,১৪২.৬৮ কোটি টাকা। অপারেশনাল ক্ষেত্রেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। জাহাজের গড় ‘টার্ন এরাউন্ড টাইম’ ৪.১ দিন থেকে কমিয়ে ২.২৪ দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া, করাচী-চট্টগ্রাম সরাসরি নৌ-রুট চালু এবং ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সাথে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি বন্দরের সক্ষমতাকে বিশ্বমানে উন্নীত করেছে।
দৃশ্যমান এত বিপুল সফলতা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পরেও চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কেন ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে বন্দরের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সিন্ডিকেট ভাঙার কঠোর পদক্ষেপের মধ্যে। দীর্ঘ সময় ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে কিছু বিশেষ গোষ্ঠী ও সিন্ডিকেট একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যে দুটি প্রধান অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার কোনোটির সাথেই তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ের সামঞ্জস্য নেই:
১. বিএসসি-তে জাহাজ ক্রয় অনিয়ম: বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনে (বিএসসি) জাহাজ ক্রয়ের যে চুক্তিতে অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে, তা স্বাক্ষরিত হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে । অথচ রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামান বিএসসি ছেড়েছিলেন ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। অর্থাৎ, যে ঘটনার দায় তাঁর ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তা ঘটেছে তিনি দায়িত্ব ছাড়ার ৯ মাস পর।
২. কর্ণফুলী ড্রেজিং প্রকল্প: কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পটি ২০১৮ সালে শুরু হয়ে অধিকাংশ কাজ ২০২২ সালের মধ্যে সম্পন্ন হয়। এস.এম. মনিরুজ্জামান বন্দরে যোগ দিয়েছেন ২০২৪ সালের আগস্টে । ৫ বছর আগের একটি প্রকল্পের দায় বর্তমান চেয়ারম্যানের ওপর চাপানো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং উদ্দেশ্যমূলক। চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এই অপপ্রচারের মূল কারণ মূলত বন্দরের দীর্ঘদিনের অরাজকতা ও সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।
এছাড়াও
১. লাইসেন্স বাতিল: টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং রাজনৈতিক প্রভাবে নেওয়া ২৩টি শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এই অপারেটররা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিল।
২. নিয়োগে স্বচ্ছতা: বিগত এক বছরে ১১৩টি পদে সরাসরি নিয়োগ এবং ৪৪৯টি পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে, যা আগে রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতো।
৩. ভূমি উদ্ধার: বন্দরের অবৈধভাবে দখলকৃত প্রায় ৫০০ একর জমি উদ্ধার এবং ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বে টার্মিনাল ভূমি রক্ষা করার মাধ্যমে প্রভাবশালী দখলদারদের স্বার্থে আঘাত করা হয়েছে।
৪. পরিবহন খরচ হ্রাস: বন্দরে সিন্ডিকেট প্রথা ভেঙে দেওয়ার ফলে পণ্য স্থানান্তরের খরচ প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে, যার সরাসরি সুফল ব্যবসায়ীরা পেলেও সিন্ডিকেটগুলোর অবৈধ আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
এই সিন্ডিকেটগুলো তাদের বিলুপ্ত আধিপত্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় এবং বর্তমান প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে নানাবিধ অপপ্রচার চালাচ্ছে। বিশেষ করে চেয়ারম্যান যখন নেদারল্যান্ডস ও ক্রোয়েশিয়া সফরে ছিলেন, তখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে একই দিনে সকল প্রচার মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হয়, যা একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত।
চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক সাফল্য কোনো জাদুমন্ত্রে আসেনি, বরং স্বচ্ছতা ও কঠোর প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ফল। যখন বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে এবং টার্ন এরাউন্ড টাইম কমছে, তখন কাল্পনিক অভিযোগ তুলে চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মূলত জাতীয় অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করার নামান্তর। সাফল্যের পরিসংখ্যান যখন কথা বলে, তখন অপপ্রচার ধোপে টিকে না।
২০২৫ সালের ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকার আয়, ৩ হাজার ১৪২ কোটি টাকার নিট মুনাফা এবং ৪৫ শতাংশ টার্ন এরাউন্ড টাইম হ্রাস করার মতো ম্যাজিক্যাল পরিবর্তনই চেয়ারম্যানের দক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে এ ধরনের দক্ষ ও নির্ভীক নেতৃত্বকে রক্ষা করা কেবল সরকারের নয়, বরং দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।
চট্টগ্রাম বন্দরকে সিন্ডিকেটমুক্ত রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে একটি গ্লোবাল লজিস্টিকস হাবে রূপান্তর করার যে রোডম্যাপ তৈরি হয়েছে, তা কোনো ষড়যন্ত্রের কাছে পরাভূত হতে দেওয়া উচিত নয়। ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে সত্যের জয় এবং বন্দরের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখাই হোক এখনকার প্রধান লক্ষ্য। আর ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীস্বার্থের এই ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে বন্দরের এই অগ্রযাত্রাকে সুরক্ষা দেওয়া এখন জাতীয় স্বার্থেই অপরিহার্য।




সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন