× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রিয়াজুল হক

প্রকাশিত: এপ্রিল ২, ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম

রপ্তানি বহুমুখীকরণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন 

রিয়াজুল হক

প্রকাশিত: এপ্রিল ২, ২০২৬, ০৭:৪৯ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অর্থনীতির রপ্তানি কাঠামো একদিকে যেমন সাফল্যের গল্প, অন্যদিকে তেমনি ঝুঁকিরও প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতার পর মাত্র কয়েক কোটি ডলারের রপ্তানি আয় থেকে আজ বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রপ্তানি আয় অর্জন করছে। এই অগ্রযাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত। তবে একই সঙ্গে এটিই বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অতিরিক্ত নির্ভরতা।

বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪-৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অর্থাৎ একটি খাতের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে পুরো রপ্তানি অর্থনীতি। বৈশ্বিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, ক্রেতা দেশের নীতিগত পরিবর্তন কিংবা প্রযুক্তিগত রূপান্তরের মতো যেকোনো ধাক্কা পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এই বাস্তবতায় বারবার আলোচনায় আসে একটি প্রশ্ন ‘তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণ কতদূর এগিয়েছে?’

রপ্তানি বহুমুখীকরণকে অনেক সময় নীতিগত লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এটি এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। বিশ্ববাজারে পোশাক খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইথিওপিয়া, এমনকি আফ্রিকার কয়েকটি দেশ কম খরচে ও উন্নত প্রযুক্তিতে পোশাক উৎপাদনে এগিয়ে আসছে। অন্যদিকে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে পরিবেশ, শ্রমমান ও কার্বন নিঃসরণ ইত্যাদি বিষয়ে চাপ বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন।

এই প্রেক্ষাপটে কৃষিভিত্তিক পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, আইসিটি ও সেবা রপ্তানি এসব খাতকে সামনে আনার কথা বহু বছর ধরে বলা হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। অথচ এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। আম, কাঁঠাল, লিচু, আলু, সবজি, মাছ এসব পণ্যের উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি সবজি ও মাছের চাহিদা বাড়ছে। তবে বড় সমস্যা হলো মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও লজিস্টিকস। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে হলে ফাইটোস্যানিটারি মান, প্যাকেজিং, কোল্ড চেইন ও ট্রেসেবিলিটির মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেখানে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কৃষিভিত্তিক রপ্তানি বড় আকার নিতে পারছে না।

এক সময় বলা হতো, তৈরি পোশাকের পর চামড়া শিল্পই হবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। কাঁচা চামড়ার উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। কিন্তু বাস্তবে চামড়া খাত আজ সংকটে। সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর অব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত শর্ত পূরণে ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন না পাওয়ার কারণে চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। অনেক বড় আন্তর্জাতিক ক্রেতা পরিবেশগত কারণে বাংলাদেশ থেকে পণ্য নিতে আগ্রহী নয়। নীতিগত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের এই ফাঁক চামড়া খাতকে পিছিয়ে দিয়েছে।

তৈরি পোশাকের বাইরে যে কয়েকটি খাত সত্যিকার অর্থে আশার আলো দেখাচ্ছে, তার একটি হচ্ছে ওষুধ শিল্প। বর্তমানে বাংলাদেশের ওষুধ ১৫০টির বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি ওষুধ ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। তবে এখানেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উন্নত দেশের বাজারে প্রবেশের জন্য যে মান ও গবেষণা বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে ওষুধ খাত ভবিষ্যতে বড় রপ্তানি স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।

হালকা প্রকৌশল খাতকে অনেকেই ‘মিসিং লিংক’ বলে থাকেন। কৃষিযন্ত্রাংশ, বাইসাইকেল পার্টস, অটো যন্ত্রাংশ ইত্যাদি পণ্যে বাংলাদেশের দক্ষতা রয়েছে। কিন্তু খাতটি এখনও অপ্রাতিষ্ঠানিকতার বেড়াজালে আটকে আছে।

আইসিটি ও সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার ও আইটি সেবা রপ্তানি বাড়ছে। তবে এটিকে বড় রপ্তানি খাতে পরিণত করতে হলে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এত আলোচনা ও নীতিপত্র থাকা সত্ত্বেও রপ্তানি বহুমুখীকরণ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না কেন? প্রথমত, নীতিগত সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। শিল্পনীতি, রপ্তানি নীতি, করনীতি ও ব্যাংকিং নীতির মধ্যে যথাযথ সমন্বয় নেই। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো ও লজিস্টিকস দুর্বল। বন্দর জট, পরিবহন ব্যয় ও সময় এসব কারণে রপ্তানির প্রতিযোগিতা কমে যায়। তৃতীয়ত, উদ্যোক্তা সহায়তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নতুন খাতে উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, গবেষণা সহায়তা ও বাজার সংযোগ এখনও দুর্বল। আবার অনেক উদ্যোক্তাও এসব সহায়তা কার্যকরভাবে ব্যবহারে দক্ষ নন।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) সুবিধা হারাবে এবং শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা কমে যাবে। এই বাস্তবতায় পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের রপ্তানি না বাড়াতে পারলে চাপ আরও বাড়বে। তখন বহুমুখীকরণ আর বিকল্প থাকবে না। এজন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতেই হবে। যেমন সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদান, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন সহজ করা এবং লজিস্টিকস ও বন্দর ব্যবস্থার সংস্কার করা।

তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের গর্ব এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একটি গাছের ছায়ায় পুরো বন টেকসই হয় না। অর্থনীতিকে নিরাপদ ও টেকসই করতে হলে রপ্তানি বহুমুখীকরণে আর দেরি করার সুযোগ নেই। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!