× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

ঢাকায় লোডশেডিং: কৃষি সুরক্ষা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের বাস্তব পদক্ষেপ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা সবসময়ই একটি জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে যখন বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন লোডশেডিং একটি অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা হিসেবে সামনে আসে। এর একদম সরাসরি কারণ হলো- চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ২৩ এপ্রিল থেকে ঢাকায় লোডশেডিং কার্যক্রম শুরু এবং এর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা সচল রাখা, বিশেষ করে বোরো চাষের জন্য পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা অনেক দিক থেকেই একটি কৌশলগত ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

প্রথমেই বুঝতে হবে, বিদ্যুৎ একটি সীমিত সম্পদ। উৎপাদন সক্ষমতা নির্দিষ্ট থাকলেও চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। শহর ও গ্রামে একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সরবরাহ নিশ্চিত করা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এই ক্ষেত্রে কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া মানে হলো দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।

বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষিনির্ভর। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদন দেশের মোট চালের একটি বড় অংশ পূরণ করে। এই সময়ে সেচ ব্যবস্থা ঠিকভাবে সচল না থাকলে শুধু কৃষকের ক্ষতি নয়, বরং পুরো দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। তাই গ্রামাঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

এই নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর প্রচেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ ছিল যে, শহরাঞ্চল বিদ্যুৎ সরবরাহে বেশি সুবিধা পায়, অথচ গ্রামাঞ্চল তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে এটি শুধু অভিযোগ নয়, বরং পরম বাস্তবতাও বটে। এই অবস্থায় যখন বিদ্যুৎ বণ্টনে ভারসাম্য আনা হয় এবং কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তখন তা সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে। এই পদক্ষেপ শহর ও পল্লীগ্রামের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির একটি বাস্তব উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

লোডশেডিংকে অনেকেই শুধু অসুবিধা হিসেবে দেখেন, কিন্তু বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এটি একটি ‘ম্যানেজমেন্ট টুল’। যখন উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেশি হয়, তখন নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয় যাতে পুরো সিস্টেম ভেঙে না পড়ে। অর্থাৎ এটি কোনো ব্যর্থতা নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রিত কৌশল। এই কৌশল ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে সচল রাখা হয় এবং অপেক্ষাকৃত কম জরুরি খাতে সাময়িক সমন্বয় করা হয়।

দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট, যার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে গড়পড়তা ১৪ হাজারের কিছু মেগাওয়াট। ফলে দেশজুড়ে ২ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে সরকার।

এ ছাড়া, জ্বালানি খাতের বাস্তব চিত্রও এই সিদ্ধান্তকে আরও যৌক্তিক করে তোলে। দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে ২ হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা শুধু অর্থের বিষয় নয়, বরং অবকাঠামোগত সক্ষমতারও বিষয়। পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় দ্রুত গ্যাস আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার তালিকায় এই অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ দৃশ্যমান অগ্রগতি পাবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাদ্য নিরাপত্তা। যদি বোরো মৌসুমে সেচ ব্যাহত হয়, তাহলে ধান উৎপাদন কমে যাবে। এর প্রভাব শুধু কৃষকের উপরই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বাজারে চালের দাম বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। তাই আগেভাগেই কৃষিকে সুরক্ষিত করা মানে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমানো।

এ ছাড়া, গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে শহরের অর্থনীতির একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গ্রামে উৎপাদন ব্যাহত হলে শহরের বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। তাই গ্রামাঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা সচল রাখা মানে পুরো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে লোডশেডিং একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার অংশ।

পরিবেশগত দিক থেকেও এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমলে অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি ব্যবহারের অপচয় কমে। বিশেষ করে যদি সিস্টেম্যাটিক্যালি বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের সাশ্রয় সম্ভব হয়। এটি ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সামাজিক বাস্তবতায়, যেকোনো বড় নীতিগত সিদ্ধান্তের কিছু সাময়িক অসুবিধা থাকে। শহরাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের কারণে কিছু ভোগান্তি তৈরি হতে পারে, কিন্তু সেই ভোগান্তির বিপরীতে যদি দেশের খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকে, তাহলে সেটিকে একটি বিনিয়োগ হিসেবেই দেখা উচিত। অনেক সময় বর্তমানের ছোট অসুবিধা ভবিষ্যতের বড় সংকট এড়াতে সাহায্য করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অগ্রাধিকার নির্ধারণ। সব খাতকে একসাথে সমানভাবে সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়া সবসময় বাস্তবসম্মত নয়। তাই কোন খাতে কখন বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, তা নির্ধারণ করাই দক্ষ প্রশাসনের লক্ষণ। এই ক্ষেত্রে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া একটি সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যায়।

অবশ্যই, এই ধরনের ব্যবস্থাপনা সফল হতে হলে স্বচ্ছতা ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। কোথায় কতটা লোডশেডিং হবে, কীভাবে সেচ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয় যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে জনগণের আস্থা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমান লোডশেডিং ব্যবস্থা শুধু একটি সংকট মোকাবেলার কৌশল নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং কৃষিভিত্তিক পরিকল্পনার অংশ। গ্রামীণ সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, বোরো উৎপাদন রক্ষা করা, খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর মতো বিষয়গুলোকে সামনে রেখে এই পদক্ষেপকে একটি বাস্তবসম্মত ও জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ভবিষ্যতে যদি এই ধরনের পরিকল্পনাকে আরও আধুনিক প্রযুক্তি, স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থা এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, তাহলে লোডশেডিংয়ের প্রয়োজন আরও কমে আসবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এটি একটি সাময়িক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Link copied!